২০২৪ সালে বিপুল জয়ের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের ক্ষমতায় এসেছিলেন কিয়ার স্টারমার। মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টিকে বড় সাফল্য এনে দেওয়া এই নেতা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসা পেলেও দুই বছরের কম সময়ের মধ্যেই নিজ দেশে ব্যাপক অজনপ্রিয়তার মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে যাচ্ছেন।
লন্ডন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সোমবার ডাউনিং স্ট্রিটের ১০ নম্বর বাসভবনের সামনে পদত্যাগের ঘোষণা দেন স্টারমার। এ সময় তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল ‘তার জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত’, তবে এখন ‘মর্যাদার সঙ্গে’ বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে।
বিদায়ী বক্তব্যে পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে তার চোখে পানি আসে। পরে স্ত্রীকে আলিঙ্গন করে ডাউনিং স্ট্রিট ছাড়েন স্টারমার।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে লেবার পার্টি। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাসের মাত্র ৪৯ দিনের সরকারসহ ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংকটের পর স্থিতিশীল নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্টারমার।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২০২৪ সালের ৫ জুলাই প্রথম ভাষণে ৬৩ বছর বয়সী স্টারমার মানুষের জীবনে ‘কম হস্তক্ষেপ’ করবে- এমন একটি ‘সেবামূলক’ সরকার গঠনের অঙ্গীকার করেছিলেন।
নিজেকে বাস্তববাদী ও প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন নেতা হিসেবে তুলে ধরেছিলেন তিনি। একই সঙ্গে সাবেক কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রীদের আদর্শনির্ভর ও আড়ম্বরপূর্ণ রাজনীতির বিপরীতে নিজের অবস্থান দেখানোর চেষ্টা করেন। বিশেষ করে বরিস জনসনের সঙ্গে নিজের নেতৃত্বের পার্থক্য তুলে ধরেছিলেন স্টারমার।
তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন নীতিগত পরিবর্তন ও সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়তে থাকেন তিনি। এতে নিজ দলের সমর্থকদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়। মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে পরিচিত স্টারমার শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশিত নির্ভরযোগ্য নেতৃত্বের ভাবমূর্তি ধরে রাখতে পারেননি।
উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে বার্নহ্যাম
স্টারমারের পর লেবার নেতৃত্বের দৌড়ে এগিয়ে আছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক জনপ্রিয় মেয়র বার্নহ্যাম সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ একটি উপনির্বাচনে জয় পেয়ে আবার পার্লামেন্টে ফিরেছেন।
স্টারমারকে অনেকেই সংযত ও দূরত্ব বজায় রাখা রাজনীতিক হিসেবে দেখলেও বার্নহ্যামকে তুলনামূলক বেশি প্রাণবন্ত এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগে দক্ষ নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
পদত্যাগের সময় স্টারমার দাবি করেন, তিনি যুক্তরাজ্যকে ‘আরও শক্তিশালী ও ন্যায়সঙ্গত’ অবস্থানে রেখে যাচ্ছেন। তবে জনমত জরিপ সংস্থা ইউগভের তথ্য বলছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার জনপ্রিয়তা নেমেছিল মাত্র ১৯ শতাংশে, যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম কম।
আইনজীবী থেকে সরকারপ্রধান
১৯৬২ সালের ২ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উপকণ্ঠে জন্ম নেন স্টারমার। ছোট একটি আধা-সংযুক্ত বাড়িতে বেড়ে ওঠেন তিনি। তার মা দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। বাবা ছিলেন কিছুটা সংসারবিমুখ, যিনি প্রাণীদের ভালোবাসতেন এবং পরিত্যক্ত গাধা উদ্ধার করতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষে মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন স্টারমার। পরে রাষ্ট্রের প্রধান কৌঁসুলি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তৎকালীন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে নাইট উপাধি দেন।
বাঁশি বাজাতে ভালোবাসা এবং আর্সেনালের সমর্থক হিসেবে পরিচিত স্টারমার ২০১৫ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২০ সালে বড় নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর জেরেমি করবিনের জায়গায় লেবার পার্টির নেতৃত্ব নেন তিনি।
দলের ভেতরে ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান, করবিনপন্থীদের প্রভাব কমানো এবং লেবারকে মধ্যপন্থার দিকে ফেরানোর মাধ্যমে ২০২৪ সালে দুই দশকের বেশি সময়ের মধ্যে দলটির সবচেয়ে বড় জয় নিশ্চিত করেন তিনি।
তবে করবিনপন্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং অভিবাসন নীতির কারণে দলের বামপন্থীদের একটি অংশ তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে।
বিতর্কে কমেছে জনপ্রিয়তা
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রবীণদের শীতকালীন জ্বালানি ভাতা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনায় পড়েন স্টারমার। পরে ওই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বাধ্য হন তিনি।
এ ছাড়া কল্যাণভাতা সংস্কার, কৃষকদের উত্তরাধিকার কর নিয়ে পরিকল্পনা প্রত্যাহার এবং বেতন কর ও ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির সিদ্ধান্তে ব্যবসায়ী মহলেও অসন্তোষ দেখা দেয়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সম্পত্তি কর কম দেওয়ার অভিযোগে উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার পদত্যাগ করেন।
একই মাসে ওয়াশিংটনে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনকে সরিয়ে দেন স্টারমার। প্রয়াত মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পরে ওই নিয়োগের জন্য ক্ষমা চান স্টারমার। তবে বিতর্ক আরও বাড়তে থাকে এবং তার ঘনিষ্ঠ দুই সহযোগীকেও দায়িত্ব ছাড়তে হয়।
এরপর মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির খারাপ ফল তার পদত্যাগের চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে সমর্থকদের মতে, ইরান যুদ্ধের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতা, ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপীয় সমর্থন ধরে রাখা এবং ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা ছিল তার গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
বিদায়ী ভাষণে জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা কমানোর বিষয়টিও নিজের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন স্টারমার।
তবে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের অনেক বিশ্লেষকের মূল্যায়নে, তিনি এমন একজন নেতা হিসেবে পরিচিত হয়েছেন, যার দৃঢ় নিজস্ব আদর্শের অভাব ছিল, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করতেন এবং প্রয়োজনে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদেরও ছাড় দিতে প্রস্তুত ছিলেন।