Skip to main content

Ridge Bangla

জনতার অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় চিরবিদায় খালেদা জিয়ার

খালেদা জিয়া ছিলেন সেই নেত্রী, যিনি সময়ের প্রয়োজনে ঘর ছেড়ে রাজপথে নেমেছিলেন, যিনি আপসকে দূরে সরিয়ে সংগ্রামকেই বেছে নিয়েছিলেন জীবনের মূল দর্শন হিসেবে। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বিদায় জানিয়েছে সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ। রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় সরকার ও বিরোধী দলে থেকেছেন পালাক্রমে। ষড়যন্ত্র ও দমন-পীড়নের মুখেও নত হননি। পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী সরকারের আমলে মিথ্যা মামলায় কারাবরণ করেও শেষ পর্যন্ত জনতার ভালোবাসায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন জাতীয় ঐক্যের এক প্রতীক।

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের রাজপথ থেকেই শুরু হয়েছিল তার বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতনের গল্প। সেই রাজপথের জনসমাবেশ একসময় ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে, আর জনতার রায়েই তিনি পৌঁছান জাতীয় সংসদ ভবনে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে বিরোধী দলে আপসহীন আন্দোলন- খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল টানা সংগ্রামের ইতিহাস। আশির দশকের আন্দোলন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, এরপর এক-এগারোর সংকট- প্রতিটি অধ্যায়েই তিনি ছিলেন দৃঢ় ও অনমনীয়।

কিন্তু এই পথচলা সহজ ছিল না। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও দমননীতির শিকার হয়ে তিনি হারিয়েছেন বাড়ি-ঘর, হারিয়েছেন ছোট সন্তানকে। কারাগারে বন্দিত্বের সময় থেকেই তার শরীরে বাসা বাঁধতে শুরু করে নানা রোগ। তবুও মাথা নোয়াননি, আপসহীনতার প্রতীক হয়েই থেকেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়েই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক।

শরীর ক্রমেই সায় দিচ্ছিল না। পরিবার ও দল সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে তাকে সুস্থ করে তুলতে। চলতি বছরের শুরুতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি যুক্তরাজ্যে যান। চাইলে সেখানেই পরিবারের সান্নিধ্যে থেকে চিকিৎসা নিতে পারতেন। কিন্তু দেশকেই বেছে নেন তিনি। একা থাকবেন, তবু দেশের মাটিতেই- এই ছিল তার দৃঢ় সিদ্ধান্ত। দেশে ফেরার পথে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে দলের নেতাকর্মীদের কাছে বারবার অনুরোধ করেছিলেন ছেলে তারেক রহমানকে দেখে রাখার জন্য। যেন তিনি নিজেই বুঝতে পারছিলেন, সময় ফুরিয়ে আসছে।

তিনি বলেছিলেন, “আমি দেশ ছেড়ে কোথাও যাব না। এই দেশই আমার একমাত্র ঠিকানা।” এক-এগারো থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামল, এমনকি দেশ ফ্যাসিস্টমুক্ত হওয়ার পরও তিনি এই অঙ্গীকারে অটল ছিলেন। বিদেশে গিয়ে নির্বিঘ্ন জীবন কাটানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সেই পথ বেছে নেননি। গোটা দেশ তা প্রত্যক্ষ করেছে, আর বিনিময়ে দিয়েছে অকৃত্রিম ভালোবাসা।

সেই ভালোবাসারই বিস্ময়কর প্রকাশ দেখা যায় তার জানাজার দিন। খালেদা জিয়াকে শেষ বিদায় জানাতে সারাদেশ থেকে ঢাকায় ছুটে আসে লাখো মানুষ। সংসদ ভবন এলাকা ছাড়িয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ, শাহবাগ, বিজয় সরণি, আগারগাঁও, শ্যামলী, নিউমার্কেট- সবখানে শুধু মানুষের ঢল। যতদূর চোখ যায়, মানুষ আর মানুষ। অনেকের চোখ ছিল অশ্রুসজল।

প্রকৃতিও যেন বিদায়ের ভাষা খুঁজে নিয়েছিল। কয়েক দিনের কনকনে শীতের পর হঠাৎই উঠেছিল মিষ্টি রোদ। এতে কিছুটা স্বস্তি পায় জানাজায় আসা জনতা। দুপুর ২টায় জানাজা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও মানুষের স্রোতের কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়। বিকেল ২টা ৪৫ মিনিটে জানাজাস্থলে পৌঁছায় জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন। এর আগে হাসপাতাল থেকে গুলশানে তারেক রহমানের বাসা হয়ে রাষ্ট্রীয় প্রোটোকলে মরদেহ আনা হয় সংসদ ভবন এলাকায়।

কফিন পৌঁছানোর পর প্রথমে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি খালেদা জিয়ার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের নানা দিক তুলে ধরেন। এরপর বিকেল ২টা ৫৮ মিনিটে দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে কথা বলেন তারেক রহমান। মা হারানোর শোকে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া জীবিত অবস্থায় কারও কাছে ঋণী থাকলে তা পরিশোধের দায়িত্ব তিনি নেবেন এবং তার কথায় বা ব্যবহারে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তার কণ্ঠে ছিল না কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা, ছিল এক সন্তানের নিঃশব্দ বেদনা।

এরপর বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেকের ইমামতিতে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এই ঐতিহাসিক জানাজায় উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তিন বাহিনীর প্রধান, দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা এবং বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, পাকিস্তানের স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি জানান দেয়, খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি জাতি-রাষ্ট্রের নেতা।

জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হয় জিয়া উদ্যানে। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। রাষ্ট্রীয় সম্মান জানাতে গান স্যালুট ও তোপধ্বনি প্রদান করা হয়। নিরাপত্তার কারণে কবরস্থানে মানুষের উপস্থিতি সীমিত থাকলেও বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন অসংখ্য মানুষ, শেষবারের মতো প্রিয় নেত্রীকে শ্রদ্ধা জানাতে।

গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী।

This post was viewed: 66

আরো পড়ুন