Skip to main content

Ridge Bangla

ছাত্র সংসদ নির্বাচন: কেন রাজনৈতিক দলগুলো এত গুরুত্ব দিচ্ছে?

​বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি বাঁক বদলের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এই দেশের ছাত্র রাজনীতি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, চব্বিশে ফ্যাসিস্টের পতন ঘটানো- প্রতিটি ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব দিয়েছে এ দেশের ছাত্রসমাজ। আর এই নেতৃত্বের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হলো ছাত্র সংসদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ডাকসু’ থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদগুলো দীর্ঘকাল ধরে জাতীয় রাজনীতির ‘নার্সারি’ বা সূতিকাগার হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চেয়েও কোনো অংশে কম নয় এমন উত্তেজনা কেন ছড়িয়ে পড়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে? কেন দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলো এই নির্বাচনের ওপর এত বেশি গুরুত্বারোপ করে?

​নেতৃত্বের সূতিকাগার ও ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি

​রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের গুরুত্ব দেওয়ার প্রধান কারণ হলো ‘নেতৃত্বের সরবরাহ নিশ্চিত করা’। বাংলাদেশের বর্তমান ও অতীতের জাতীয় পর্যায়ের অনেক সফল নেতার হাতেখড়ি হয়েছে ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এমন সব মেধাবী ও বাগ্মী নেতৃত্ব বেরিয়ে আসে, যারা ভবিষ্যতে মূল রাজনৈতিক দলের হাল ধরবে। দলগুলো চায় তাদের আদর্শে বিশ্বাসী যোগ্য নেতৃত্ব ছাত্র সংসদ থেকে উঠে আসুক। এখান থেকেই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ভবিষ্যৎ কেন্দ্রীয় নেতা, সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদের খুঁজে নেয়। ফলে এই নির্বাচনকে তারা নিজেদের দলের ভবিষ্যৎ মজবুত করার এক অপরিহার্য ধাপ হিসেবে বিবেচনা করে।

​সাংগঠনিক শক্তির প্রদর্শন ও ক্যাডার ভিত্তি

​জাতীয় রাজনীতিতে পেশিশক্তি এবং সাংগঠনিক সক্ষমতার একটি বড় উৎস হলো ছাত্র সংগঠনগুলো। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানে হলো ক্যাম্পাসগুলোতে দলের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখা। একটি ছাত্র সংসদ যখন কোনো নির্দিষ্ট দলের আদর্শে পরিচালিত হয়, তখন সেই দলের পক্ষে বিশাল কর্মী বাহিনী তৈরি হয়। জাতীয় নির্বাচন বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এই বিশাল ছাত্রশক্তিকে দলগুলো ব্যবহার করতে পারে। এছাড়া ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল পর্যন্ত দলের চেইন অফ কমান্ড বা সাংগঠনিক বিন্যাস যাচাই করার সুযোগ পায় রাজনৈতিক দলগুলো।

​রাজনৈতিক আদর্শের প্রচার ও প্রসার

​বিশ্ববিদ্যালয় হলো মুক্তচিন্তার জায়গা। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ইশতেহার, দর্শন ও আদর্শ তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ছাত্র সংগঠনগুলোকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানে হলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেই দলের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাওয়া। এটি দলের প্রতি তরুণ সমাজের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়। দলগুলো মনে করে, তরুণ বয়সে একজন শিক্ষার্থী যে আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়, সারাজীবনের জন্য সে সেই রাজনৈতিক বলয়ে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই একটি নতুন ‘ভোট ব্যাংক’ তৈরির লক্ষ্যেই দলগুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।

​জনপ্রিয়তার মানদন্ড ও মনস্তাত্ত্বিক বিজয়

​ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনেক সময় জাতীয় রাজনীতির জনপ্রিয়তার মানদণ্ড হিসেবে কাজ করে। কোনো ক্যাম্পাস নির্বাচনে যদি সরকারি দল বা বিরোধী দলের সমর্থিত প্যানেল জয়ী হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়। একে কোনো রাজনৈতিক দলের গ্রহণযোগ্যতার ‘লিটমাস টেস্ট’ বলা যেতে পারে। বিশেষ করে যখন জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে আসে, তখন ছাত্র সংসদের ফলাফলকে জনমতের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়। এই নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানে প্রতিপক্ষ দলের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা এবং নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উৎসাহ ও উদ্দীপনা সঞ্চার করা।

​ক্যাম্পাসের পরিবেশ ও আবাসিক হল নিয়ন্ত্রণ

​বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছাত্র সংসদ নির্বাচন মানে কেবল একাডেমিক দাবি-দাওয়া নয়, বরং আবাসিক হলগুলোর নিয়ন্ত্রণও এর সাথে যুক্ত। প্রতিটি রাজনৈতিক দল চায় তাদের ছাত্র সংগঠন ক্যাম্পাসে এবং হলগুলোতে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকুক। ছাত্র সংসদের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সিট বণ্টন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা তদারকি করা হয়। এই প্রশাসনিক ও কাঠামোগত প্রভাব ধরে রাখার মাধ্যমেই ক্যাম্পাসে নিজেদের দলের কর্তৃত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়। এই আধিপত্য বজায় থাকলে ক্যাম্পাসে অন্য কোনো বিরোধী শক্তি সহজে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে না, যা মূল রাজনৈতিক দলের জন্য স্বস্তিদায়ক।

​সামাজিক প্রভাব ও জনমত গঠন

​বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা সমাজ ও পরিবারের কাছে সচেতন নাগরিক হিসেবে পরিচিত। তাদের মতামত গ্রামীণ এবং সাধারণ মধ্যবিত্ত সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জয়ী প্রতিনিধিরা যখন এলাকায় গিয়ে কথা বলেন, তখন তা দলের প্রচারণায় বাড়তি মাত্রা যোগ করে। দলগুলো বিশ্বাস করে, যদি তারা মেধাবী ও জনপ্রিয় ছাত্রনেতাদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে, তবে জাতীয় নির্বাচনে সাধারণ ভোটারের মন জয় করা সহজ হবে।

​ছাত্র সংসদ নির্বাচন হওয়া উচিত সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের এবং গণতান্ত্রিক চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন নয়, বরং জাতীয় রাজনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর এই অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার নেপথ্যে যেমন নেতৃত্বের উত্তরাধিকার রক্ষার তাগিদ রয়েছে, তেমনি রয়েছে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার কৌশল। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, ছাত্র রাজনীতি যদি কেবল মূল দলের লেজুড়বৃত্তি এবং ক্ষমতার লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়, তবে তা শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত করতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি একে সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক চর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা, যাতে এখান থেকে বেরিয়ে আসা নেতৃত্ব কেবল দলের নয়, বরং সমগ্র জাতির কল্যাণে ভূমিকা রাখতে পারে।

This post was viewed: 39

আরো পড়ুন