Skip to main content

Ridge Bangla

কেন আমেরিকায় কখনও একনায়কতন্ত্র আসেনি?

​মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রাচীনতম স্থিতিশীল গণতন্ত্রগুলোর একটি। দেশটি বহু অভ্যন্তরীণ সংকট, যুদ্ধ এবং রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করেছে। কিন্তু কখনই কোনো একনায়কতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসকের উত্থান দেখেনি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের মতে, আমেরিকার এই স্থিতিশীলতার নেপথ্যে কোনো একক কারণ নেই, বরং রয়েছে সুচিন্তিত সাংবিধানিক কাঠামো, ক্ষমতার বিভাজন এবং শক্তিশালী নাগরিক সংস্কৃতির এক দুর্ভেদ্য সমন্বয়। যে কাঠামোগত নিরাপত্তাগুলো আমেরিকাকে স্বৈরতন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করে এসেছে, সেগুলো সম্পর্কে জানা জরুরি।

​আমেরিকার স্থপতিরা সচেতন ছিলেন যে, ক্ষমতা কোনো একক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হলে তা স্বৈরাচারে পরিণত হতে পারে। তাই তারা সংবিধানে ক্ষমতার কঠোর বিভাজন নীতি (Separation of Powers) প্রয়োগ করেন, যা একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা ব্যবস্থা। আমেরিকায় ক্ষমতাকে তিনটি স্বতন্ত্র শাখায় ভাগ করা হয়েছে- নির্বাহী বিভাগ (রাষ্ট্রপতি), আইনসভা (কংগ্রেস) এবং বিচার বিভাগ (সুপ্রিম কোর্ট)।

​এই তিনটি শাখা একে অপরের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। উদাহরণস্বরূপ, রাষ্ট্রপতিকে আইনসভা অভিশংসন (Impeachment) করতে পারে, আবার আইনসভার তৈরি আইনকে সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করতে পারে। অন্য দিকে, রাষ্ট্রপতি আইনসভায় ভেটো দিতে পারেন। মার্কিন আইনসভা তথা কংগ্রেসের হাতে রাষ্ট্রপতির যুদ্ধ ঘোষণার ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে৷ এছাড়া বাজেট অনুমোদন করা এবং বিভিন্ন নিয়োগ নিশ্চিত করার ক্ষমতারও অর্পণ করা হয়েছে আইনসভার হাতে। এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে রাষ্ট্রপতি, যিনি নির্বাহী প্রধান, তিনি কখনোই সর্বেসর্বা হয়ে উঠতে পারবেন না।

​আমেরিকা একটি এককেন্দ্রিক রাষ্ট্র নয়, বরং ফেডারেল কাঠামোয় গঠিত। এই ব্যবস্থাটির কারণে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা রাজ্যের বিভিন্ন স্তরে ভাগ হয়ে যায়। এর ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কঠিন হয়ে ওঠে। এর পাশাপাশি প্রতিটি রাজ্য তাদের নিজস্ব আইন, প্রশাসন এবং বিচার ব্যবস্থা বজায় রাখে। রাজ্য সরকারগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন দল ক্ষমতায় থাকে। ফলে, যদি কোনো চরমপন্থী দল কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করে, তবুও তারা সমস্ত রাজ্যের উপর একই নীতি জোর করে চাপিয়ে দিতে পারে না। এই বিকেন্দ্রীকরণ স্থানীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে এবং একনায়কের পক্ষে গোটা দেশকে বশীভূত করা কঠিন করে তোলে।

​​সামরিক অভ্যুত্থান এবং সেনাবাহিনী কর্তৃক ক্ষমতা দখলের প্রবণতা স্বৈরাচারী শাসনের অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু আমেরিকায় সেনাবাহিনী শুরু থেকেই কঠোরভাবে বেসামরিক কর্তৃপক্ষের (রাষ্ট্রপতির) নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং এখনও আছে। সংবিধান অনুসারে, রাষ্ট্রপতি হলেন সামরিক বাহিনীর প্রধান (Commander-in-Chief), যিনি একজন নির্বাচিত অসামরিক ব্যক্তি। সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্য প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এছাড়া আমেরিকান সামরিক বাহিনীর মধ্যে বহু শতাব্দী ধরে এই ঐতিহ্য গেঁথে আছে যে, তারা জনগণের নির্বাচিত সরকারের প্রতি অনুগত থাকবে, কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি নয়।

​আমেরিকান সমাজের গভীরে প্রোথিত আছে নাগরিক স্বাধীনতা এবং অধিকারের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার। একে একটি ‘সফট পাওয়ার’ বলা যেতে পারে, যা স্বৈরাচারকে নাগরিক সমাজ থেকে প্রতিহত করে। একটি স্বাধীন এবং শক্তিশালী গণমাধ্যম (Media) সবসময় সরকারের সমালোচনামূলক দৃষ্টি রাখে এবং যেকোনো ক্ষমতার অপব্যবহারের ঘটনা জনসমক্ষে নিয়ে আসে। ফলে সরকারের স্বেচ্ছাচারী হওয়ার সুযোগ কমে আসে।

আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম সংশোধনী (First Amendment) দ্বারা সুরক্ষিত বাকস্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার, জনগণের কাছে সরকারের বিরোধিতা করার এবং প্রতিবাদ জানানোর অধিকার প্রদান করা হয়েছে। যদি কোনো শাসক স্বৈরাচারী হতে চায়, তবে তার বিরুদ্ধে দ্রুত জনমত এবং প্রতিবাদ সংগঠিত হয়।

​আমেরিকার বিচার বিভাগ, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট, রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত। এটি নিশ্চিত করে যে কোনো শাসক আইন লঙ্ঘন করলে বা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করতে চাইলে, বিচার বিভাগ তাতে বাধা দিতে পারে। বিচারকদের দীর্ঘ ও সুরক্ষিত মেয়াদ এবং সংবিধান রক্ষার দায়িত্ব তাদেরকে নির্ভীক থাকতে সাহায্য করে।

​আমেরিকায় একনায়কতন্ত্র না আসার কারণটি তার প্রতিষ্ঠানের স্থিতিস্থাপকতা এবং জনগণের সতর্কতার মধ্যে নিহিত। ক্ষমতার বিভাজন, ফেডারেল ব্যবস্থা, সামরিক বাহিনীর ওপর বেসামরিক নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীন গণমাধ্যম- এই সবগুলো একত্রে এমন একটি অবিচ্ছেদ্য দুর্গ তৈরি করেছে, যেটি লঙ্ঘন করা অসম্ভব। দেশের মানুষ জানে যে গণতন্ত্র কেবল ভোট দেওয়ার অধিকার নয়, বরং এটি সংবিধান, আইন এবং ঐতিহ্যের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষমতার উপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানোর একটি প্রক্রিয়া। তাই যখনই কোনো নেতা স্বৈরাচারী মনোভাব দেখান, দেশের সংবিধান ও সংস্কৃতি তাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য প্রস্তুত থাকে।

This post was viewed: 56

আরো পড়ুন