নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার মতো যাঁর জীবন, কণ্ঠে বিপ্লবী জোশে আগুন ঝরায় যাঁর দ্রোহের পংক্তিমালা- তিনিই ওসমান হাদি। এই সময়ের বেশিরভাগ তরুণ হয়তো গর্ব করে যে তারা ওসমান হাদির প্রজন্মে জন্মেছে। খুব কাছ থেকে তাঁকে দেখেছে কিংবা তাঁর বক্তব্য শুনেছে।
১২ ডিসেম্বর (শুক্রবার) সকালটা আর পাঁচটা দিনের মতোই শুরু হয়েছিল অকুতোভয় তরুণ ওসমান হাদির। রাজধানীর সেগুনবাগিচা ও মতিঝিল এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় সক্রিয় ছিলেন তিনি। জুমার নামাজ শেষে কর্মীদের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। সেখানে মধ্যাহ্নভোজেরও আয়োজন ছিল। কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ হলো না।
দুপুরের দিকে বিজয়নগরের কালভার্ট রোড এলাকায় মোটরসাইকেলে আসা নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতার গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়। চিকিৎসকদের ভাষায়, তাঁর অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। দেশজুড়ে তাঁর সুস্থতার জন্য প্রার্থনায় একাত্ম হন লাখো মানুষ।
অবশেষে শরিফ ওসমান বিন হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়েছিল। সিঙ্গাপুরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে আল-জাজিরা জানায়, চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাঁর আঘাত ছিল প্রাণঘাতী। তাই তাঁকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
যাঁকে ঘিরে এই উদ্বেগ, তিনি জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখ ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্রুত উত্থানই তাঁকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মাত্র ৩৩ বছর বয়সেই ওসমান হাদি রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হন। উচ্চকিত কণ্ঠ, আপসহীন বক্তব্য ও স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তিনি যেমন সমালোচনার মুখে পড়েছেন, তেমনি তরুণ সমাজের কাছে হয়ে উঠেছেন প্রতিবাদের প্রতীক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থান এবং ব্যক্তিগত জীবনের ত্যাগ তাঁকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়।
২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ছড়িয়ে পড়লে রাজধানীর রামপুরা, মালিবাগ ও বিজয়নগরের রাজপথে বারবার উচ্চারিত হয় হাদির নাম। কাঁদানে গ্যাস, ধোঁয়া আর ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যেও তরুণদের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি বলতেন, “ভয় পাবেন না, আমরা ন্যায়বিচার চাই। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কেউ ঘরে ফিরব না।” আজ সেই কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে গেছে, স্তব্ধ পুরো দেশ।
ওসমান হাদির জন্ম ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার এক সাধারণ পরিবারে। বাবা ছিলেন মাদরাসার শিক্ষক ও ইমাম- মমতাবান ও সত্যনিষ্ঠ একজন মানুষ। হাদি নিজেই বলেছেন, সত্য বলার সাহস তিনি বাবার কাছ থেকেই পেয়েছেন। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট।
শিক্ষাজীবনের শুরু নেছারাবাদ কামিল মাদরাসায়। স্কুলজীবনেই লেখালেখির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় এবং জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কারও অর্জন করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে (২০১০–১১ শিক্ষাবর্ষ) ভর্তি হন। তবে মাদরাসা থেকে আসা শিক্ষার্থী হওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে নানা তকমা, পক্ষপাত ও রাজনৈতিক হয়রানির মুখে পড়তে হয় তাকে। ‘শিবির’ বা ‘হেফাজত’- এ ধরনের অপবাদ বারবার তাঁকে বিব্রত করেছে। অনেকের মতে, এই অভিজ্ঞতাই তাঁর ভেতরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করে।
পেশাগত জীবনে ওসমান হাদি ইংরেজি শেখানোর কোচিং সেন্টার সাইফুরস-এ শিক্ষকতা করেছেন। সর্বশেষ তিনি ইউনিভার্সিটি অব স্কলার্স নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ব্যক্তিগত জীবনে বড় ত্যাগ স্বীকার করেন তিনি। ঘরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী থাকলেও আন্দোলনে সাড়া দিয়ে রাজপথেই থেকেছেন। অগ্নিঝরা রাতে ফুটপাতে ঘুমিয়েছেন, ক্লান্ত শরীর নিয়ে দিয়েছেন দিনের পর দিন স্লোগান। সহিংসতা, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, গ্রেপ্তার ও নিখোঁজের মতো ভয়াবহ দৃশ্য চোখের সামনে দেখেও পিছু হটেননি।
৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হাদি যখন নিজ জেলা ঝালকাঠিতে ফেরেন, তখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আশঙ্কা দেখা দেয়। সে সময় তিনি ভিন্ন ভূমিকায় আবির্ভূত হন। মহল্লা মহল্লায় গিয়ে পাহারা দল গঠন করেন, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্রিয় হন। তার ভাষায়, “স্বাধীনতার চেতনা মানে সকল মানুষের নিরাপত্তা।“
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নয়, বরং আন্দোলনের চেতনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চেয়েছিলেন ওসমান হাদি। সেখান থেকেই জন্ম নেয় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য- সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ।
ইনকিলাব মঞ্চ কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল নয়। ওসমান হাদির ভাষায়, এটি ‘শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার সংগ্রামের সাংগঠনিক রূপ’। সংগঠনটি নিয়ে সমালোচনা যেমন রয়েছে, তেমনি তরুণদের বড় একটি অংশের সমর্থনও পেয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডকে ছাড় দেওয়া হবে না।“
গত নভেম্বর মাসে নিজের ফেসবুক পোস্টে ওসমান হাদি দাবি করেন, দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নম্বর থেকে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাঁর বাড়িতে আগুন দেওয়া এবং মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকির কথাও উল্লেখ করেন তিনি। ওই পোস্টে তিনি লেখেন, এসব হুমকি সত্ত্বেও ‘ইনসাফের লড়াই’ থেকে তিনি সরে দাঁড়াবেন না।
ওসমান হাদির ওপর হামলার ঘটনায় রাজনৈতিক বিভাজন অনেকটাই মুছে গেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এক কণ্ঠে হামলার নিন্দা জানিয়েছে, রাজপথে নেমেছে প্রতিবাদে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ওসমান হাদির ওপর হামলা বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণ-অধিকার পরিষদ, জামায়াতে ইসলামী সহ বিভিন্ন দলের নেতাও হাদির সুস্থতার জন্য দোয়া ও সংহতি প্রকাশ করেছেন।
শরিফ ওসমান বিন হাদির রাজনৈতিক যাত্রা দীর্ঘদিনের নয়। কিন্তু ব্যক্তিত্ব, প্রতিবাদী অবস্থান ও জনস্বার্থে নির্ভীক ভূমিকার কারণে তিনি এমন এক নাম হয়ে উঠেছেন, যা নিয়ে এখন চলছে দেশজুড়ে আলোচনার জোয়ার।
রাজনীতিতে স্বচ্ছতা, গণতান্ত্রিক সংস্কার ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের যে স্বপ্ন তিনি দেখতেন, তা এখনও অপূর্ণ। হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে থাকা হাদির দিকে তাকিয়ে ছিল একটি পরিবার। আর রাজপথে, সামাজিক মাধ্যম ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনায় ছিল দেশের কোটি কোটি মানুষ। কিন্তু তিনি আর আমাদের মাঝে ফেরেননি।
ওসমান হাদিদের মতো ক্ষণজন্মা মহাপুরুষরা জাতিকে অনাগত দিনগুলোতে চলার পথ দেখান, নিজে নিঃশেষ হয়ে বারুদ জ্বালিয়ে দিয়ে যান অগণিত তরুণ-তরুণীর বুকে। ওসমান হাদি আসলে মারা যাননি, এ দেশের আগামী প্রজন্মের তরুণদের মধ্য দিয়ে তিনি ফিরে আসবেন বারবার; যারা হাদির নাম ও চেতনা বুকে ধারণ করে চালিয়ে নিয়ে যাবে তাঁরই লড়াই… ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লড়াই।