শুক্রবার সকাল থেকে রাজধানীর সেগুনবাগিচা ও মতিঝিল এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন তরুণ রাজনীতিবিদ ওসমান হাদি। জুমার নামাজ শেষে কর্মীদের সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। সেখানেই মধ্যাহ্নভোজ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেই যাত্রা আর পূর্ণ হলো না। বিজয়নগরের কালভার্ট রোডে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে তিনি এখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন এই তরুণ নেতার জন্য আজ প্রার্থনায় একাত্ম হয়েছে দেশের কোটি মানুষ।
যাঁর নাম ঘিরে এই উৎকণ্ঠা, তিনি জুলাই আন্দোলনের অকুতোভয় সংগঠক, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন হলেও অল্প সময়েই তাঁর জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো বেড়েছিল। অনেকের মতে, সেই দ্রুত উত্থানই তাঁর জন্য হয়ে ওঠে বড় ঝুঁকি।
মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। উচ্চকিত কণ্ঠ, আপসহীন ভাষা ও স্পষ্ট অবস্থানের কারণে তিনি যেমন সমালোচিত হয়েছেন, তেমনি তরুণ সমাজের কাছে হয়ে উঠেছেন আদর্শের প্রতীক। রাজপথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় উচ্চারণ এবং ব্যক্তিগত জীবনের ত্যাগ তাঁকে একটি আলাদা পরিচয় দিয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান যখন সারা দেশকে আন্দোলিত করে তোলে, তখন রাজধানীর রামপুরা, মালিবাগ, বিজয়নগরসহ বিভিন্ন এলাকায় বারবার শোনা যাচ্ছিল এক নাম- হাদি। ধোঁয়া, কাঁদানে গ্যাস আর পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যেও সামনে দাঁড়িয়ে তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলতেন, “ভয় পাবেন না, আমরা ন্যায়বিচার চাই। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কেউ ঘরে ফিরব না।”
সেই সময় ঘরে ছিলেন তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী। ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়ে পরিবারের পাশে থাকার কথা থাকলেও তিনি বেছে নিয়েছিলেন রাজপথ। অনেক রাত কাটিয়েছেন ফুটপাতে, ক্লান্ত শরীর নিয়ে টেনেছেন পরদিনের আন্দোলন। তাঁর চোখের সামনেই ঘটেছে সহিংসতা, গ্রেপ্তার, নিখোঁজের করুণ দৃশ্য। তবুও একবারের জন্যও পিছু হটেননি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি নিজ জেলা ঝালকাঠিতে ফিরে যান। তখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে হাদি নিজেকে তুলে ধরেন ভিন্ন রূপে, শান্তির দূত হিসেবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দির ও সংখ্যালঘু এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মহল্লা-মহল্লায় পাহারাদল গড়ে তোলেন। তাঁর ভাষায়, স্বাধীনতার চেতনা মানে শুধু ক্ষমতার বদল নয়, সব মানুষের নিরাপত্তা।
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম শরিফ ওসমান হাদির। বাবা মাদরাসার শিক্ষক ও ইমাম, সৎ ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ। হাদি নিজেই বলেন, সত্য বলার সাহস তিনি পেয়েছেন বাবার কাছ থেকেই। স্কুলজীবন থেকেই লেখালেখির প্রতি ঝোঁক ছিল তাঁর, পেয়েছেন জাতীয় পুরস্কারও। নেছারাবাদ কামিল মাদরাসা থেকে শিক্ষা শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে।
তবে মাদরাসাশিক্ষার্থী হওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁকে নানা বৈষম্য ও তকমার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বারবার ‘শিবির’ বা ‘হেফাজত’ ট্যাগ দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁর। এই অভিজ্ঞতাই হয়তো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানসিক দৃঢ়তা তৈরি করেছে বলে মনে করেন ঘনিষ্ঠজনরা।
গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নয়, বরং আন্দোলনের চেতনাকে সাংগঠনিক রূপ দিতে চেয়েছিলেন হাদি। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘ইনকিলাব মঞ্চ’। এটি কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল নয়, বরং তাঁর ভাষায়, শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার সংগ্রামের একটি প্ল্যাটফর্ম। এই সংগঠনের প্রতি তরুণদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক সমর্থন। কারণ, হাদি সবসময়ই জাতীয় স্বার্থবিরোধী যেকোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন।
শরিফ ওসমান হাদির ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার ওপর আক্রমণ নয়। অনেকের চোখে এটি দেশের বিবেকের ওপর আঘাত। মতাদর্শ ও দলীয় বিভাজন ভুলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠন তাঁর সুস্থতা কামনা করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “হাদি আমাদের সবার অতি আপন। তাঁর ওপর হামলা বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর আঘাত।”
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি তুলেছেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা, গণ-অধিকার পরিষদের নেতৃত্বসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি এক কণ্ঠে বলেছেন, হাদির মতো স্পষ্টবাদী ও সাহসী তরুণ রাজনীতিতে প্রয়োজন।
শরিফ ওসমান হাদির রাজনৈতিক যাত্রা দীর্ঘ নয়। কিন্তু অল্প সময়েই প্রতিবাদী অবস্থান, জনস্বার্থে নির্ভীক ভূমিকা ও ব্যক্তিগত ত্যাগ তাঁকে আলাদা করে চিনিয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে রয়েছে স্বচ্ছতা, গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন। হাদির গল্প শুধু রাজনীতির গল্প নয়, এটি এক তরুণের সাহস, স্বপ্ন ও বিশ্বাসের কাহিনি। একদিকে তাঁর ঘরের দরজায় অপেক্ষা করছে পরিবার, অন্যদিকে রাজপথে অপেক্ষায় লাখো মানুষ।