Ridge Bangla

ইরানের গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপট: ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা

​ইরানের রাজপথ গত কয়েক বছর ধরে এক অভূতপূর্ব অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ (জ্যান, জিয়ান, আজাদি)- এই স্লোগানে প্রকম্পিত তেহরান থেকে শুরু করে মাশহাদ কিংবা কুর্দিস্তান। আপাতদৃষ্টিতে এটি পোশাকের স্বাধীনতার আন্দোলন মনে হলেও, এর গভীরে রয়েছে কয়েক দশকের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, অর্থনৈতিক নিস্পেষণ এবং রাজনৈতিক অধিকারহীনতার এক দীর্ঘ ইতিহাস। ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল, তা আসলে একটি দীর্ঘস্থায়ী জনঅসন্তোষের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

​অগ্ন্যুৎপাতের সূচনা: মাহসা আমিনি ও নৈতিক পুলিশ

​২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনিকে তেহরানের রাস্তা থেকে আটক করে দেশটির ‘নৈতিক পুলিশ’ বা ‘গাশত-ই এরশাদ’। অভিযোগ ছিল, তিনি সঠিকভাবে হিজাব পরেননি। তিন দিন পর পুলিশি হেফাজতে তার মৃত্যু হলে পুরো ইরান স্তব্ধ হয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে মানুষের দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে যায়। এটি আর কেবল হিজাব কিংবা পোশাকের বিধিবিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি হয়ে ওঠে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক বিশাল গণঅভ্যুত্থান।

​আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা প্রধান কারণসমূহ

​ইরানের এই আন্দোলনের পেছনে কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘটনা কাজ করেনি, বরং বেশ কিছু মৌলিক ও কাঠামোগত সমস্যা এই বিক্ষোভকে জ্বালানি জুগিয়েছে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নারীর অধিকারের দাবি অন্যতম প্রধান দাবি। ​১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর ইরানে নারীদের জন্য কঠোর পোশাক নীতি বাধ্যতামূলক করা হয়। কয়েক দশক ধরে ইরানের নারীরা এই বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে ছোট ছোট প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন। কিন্তু ‘গাশত-ই এরশাদ’-এর ক্রমবর্ধমান কড়াকড়ি এবং নারীদের ওপর শারীরিক লাঞ্ছনা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। মাহসা আমিনির ঘটনাটি ছিল সেই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার মুহূর্ত। নারীরা প্রকাশ্যে হিজাব পুড়িয়ে এবং চুল কেটে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, তারা তাদের শরীরের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আর মেনে নিতে রাজি নন।

​ইরানের অর্থনীতির অবস্থা গত এক দশকে অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, বিশেষ করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটির তেল রপ্তানি কমে গেছে এবং মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখন তলানিতে। ৪০ শতাংশের উপরে মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্বের হার তরুণ প্রজন্মকে দিশেহারা করে তুলেছে। একদিকে মানুষ যখন দুবেলা খাবারের জন্য লড়াই করছে, অন্যদিকে তখন দুর্নীতির খবর সাধারণ মানুষকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। অর্থনৈতিক এই চরম দুর্দশা মানুষকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে, যার ফলে তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে।

​ইরানে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অত্যন্ত সীমিত। গণমাধ্যম রাষ্ট্রের কঠোর নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং যেকোনো ধরনের ভিন্নমতকে কঠোরভাবে দমন করা হয়। বিগত নির্বাচনগুলোতে সংস্কারপন্থী প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণা করা এবং কট্টরপন্থীদের একচেটিয়া আধিপত্য সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি করেছে যে, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে পরিবর্তন আনা অসম্ভব। রাজনৈতিকভাবে কণ্ঠরোধ করার এই সংস্কৃতি জনগণকে রাজপথের আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এছাড়া ইরানের বর্তমান জনসংখ্যার এক বিশাল অংশ হচ্ছে তরুণ এবং কিশোর (জেনারেশন জেড)। এই প্রজন্মের চিন্তাধারা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবীদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তারা ইন্টারনেটের যুগে বড় হয়েছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের জীবনযাত্রা সম্পর্কে তারা সচেতন। তারা ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত জীবনে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপকে সেকেলে ও অপ্রয়োজনীয় মনে করে। এই আধুনিক মনস্ক তরুণ প্রজন্মের সাথে রাষ্ট্রের রক্ষণশীল কাঠামোর যে সংঘাত, তা এই আন্দোলনের প্রাণশক্তি।

আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া

​পূর্ববর্তী আন্দোলনগুলোর তুলনায় এবারের বিক্ষোভের একটি বিশেষ দিক হলো এর ব্যাপকতা। ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক, শ্রমিক এমনকি সমাজের রক্ষণশীল অংশের অনেক মানুষও এই আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছেন। সরকার এই আন্দোলন দমাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করা, হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বলপ্রয়োগ করে হয়তো সাময়িকভাবে রাস্তা খালি করা সম্ভব, কিন্তু মানুষের মনের ভেতরে থাকা ক্ষোভের আগুন নেভানো অসম্ভব।

​ইরানের এই গণআন্দোলন কেবল এক টুকরো কাপড়ের বিরুদ্ধে লড়াই নয়; এটি মূলত মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার লড়াই। এটি স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং একটি ভেঙে পড়া অর্থনীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের আর্তনাদ। আন্দোলন হয়তো কখনো স্তিমিত হয়, আবার কখনো নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। তবে প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যতক্ষণ পর্যন্ত জনগণের মৌলিক অধিকার এবং অর্থনৈতিক চাহিদার সমাধান না হবে, ততক্ষণ ইরানের এই অস্থিরতা কাটবে না। ইরানের সমাজ এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে পেছনে ফেরার পথ হয়তো চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে।

This post was viewed: 8

আরো পড়ুন