Ridge Bangla

আধ্যাত্মিকতা থেকে অস্থিরতার কেন্দ্র মাজার, ২০ মাসে ৬৭ হামলা

বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মাজারগুলো বর্তমানে এক চরম অস্থিরতার মুখোমুখি। গত ২০ মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাজারকেন্দ্রিক হামলার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দেশের আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত এই ২০ মাসে সারাদেশে মোট ৬৭টি মাজারকেন্দ্রিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। অথচ এসব ঘটনার আইনি প্রতিকার ও বিচারের চিত্রটি হতাশাজনক।

সবশেষ ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকার দরবার শরিফে হামলা ও দরবার প্রধান আব্দুর রহমান হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এই সহিংসতা ঘটানো হয়। দুঃখজনক বিষয় হলো, নিহতের পরিবার মামলা দায়ের করলেও প্রধান অভিযুক্ত রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, যা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

শুধু এই একটি ঘটনাই নয়, গত ২০ মাসে সিলেটে হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারে হামলা করে গান-বাজনা নিষিদ্ধের দাবি থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জে দেওয়ানবাগী ও ল্যাংটা বাবার মাজারে অগ্নিসংযোগ, গাজীপুরে শাহ সুফি ফসিহ পাগলার মাজারে তাণ্ডব, সিরাজগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে মাজার ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটেছে। এ সময় কুমিল্লার হোমনায় মাইকে ঘোষণা দিয়ে চারটি মাজারে হামলা ও ভাঙচুর, ধামরাইয়ে ৩ মাজারে হামলার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই ৬৭টি ঘটনায় সারাদেশে মাত্র ২৬টি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। বাকি ঘটনাগুলোর অধিকাংশই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা প্রাথমিক পর্যায়ের আইনি প্রক্রিয়ায়। এর নেপথ্যে অনেক সময় ভুক্তভোগী পক্ষের অনাগ্রহ থাকলেও, মামলার হার কম থাকার বিষয়টি বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থার সংকটকেও নির্দেশ করছে।

আঞ্চলিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাজারকেন্দ্রিক অস্থিরতা সবচেয়ে প্রকট ঢাকা ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে। ঢাকা রেঞ্জে সর্বোচ্চ ২৫টি ঘটনা এবং রেকর্ড ৩৩ জন গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়। তবে গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী তৎপরতা দেখা গেছে ময়মনসিংহ রেঞ্জে, যেখানে ৮টি ঘটনায় ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট রেঞ্জের মতো এলাকাগুলোতে ঘটনার তুলনায় গ্রেপ্তার বা নিয়মিত মামলার সংখ্যা নগণ্য। বিশেষ করে সিলেট রেঞ্জে দুটি হামলার ঘটনায় দুটি জিডি হলেও কোনো মামলা বা গ্রেপ্তার নেই, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে।

বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। দায়ের করা ২৬টি মামলার মধ্যে মাত্র ৯টিতে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। ১১টি মামলার তদন্ত ২০ মাস পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি। ৬টি মামলার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, অর্ধেকের বেশি ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। যদিও মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোতে হামলার ঘটনা তুলনামূলক কম এবং সেখানে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হার সন্তোষজনক, কিন্তু সামগ্রিক চিত্রটি বেশ নাজুক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব হামলার পেছনে কেবল ধর্মীয় কারণ নেই, এর আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও সুদূরপ্রসারী স্বার্থ জড়িত থাকার সম্ভাবনা প্রবল। ধর্মীয় ব্যাখ্যার আড়ালে সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়ার যে প্রবণতা দেখা দিচ্ছে, তা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি। কার্যকর ও দ্রুত বিচারের অভাব অপরাধীদের সাহস জোগাচ্ছে, যার ফলে এ ধরনের সহিংসতা বারবার ঘটছে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দাবি, আইনি প্রক্রিয়া থেমে নেই এবং তারা যথাযথভাবে কাজ করছেন। কিন্তু ২০ মাসের দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও অধিকাংশ মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া এবং অভিযুক্তদের অবাধ বিচরণ ন্যায়বিচারের পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে। মাজারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এসব হামলার নেপথ্যের কুশীলবদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, বিচারহীনতার সংস্কৃতি কেবল সহিংসতাকেই উসকে দেবে।

This post was viewed: 15

আরো পড়ুন