Ridge Bangla

অস্বাভাবিক লোডশেডিংয়ের কবলে গোটা দেশ

গ্রীষ্মের গরমে হাঁসফাঁস করছে মানুষ, এর মধ্যে নেই বিদ্যুৎ। মাথার উপর থাকা ফ্যানটি স্থির হয়ে আছে, ফোটা ফোটা ঘামে নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। শহরের মানুষ বাসার ছাদে খোঁজ করছেন ঠান্ডা হাওয়ার, গ্রামের মানুষ আশ্রয় খুঁজছেন গাছের ছায়ায়। কেউ কেউ তো ঘরে বসেই ফিরে যাচ্ছেন পুরনো অভ্যাসে। হাতপাখা ঘুরিয়ে স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা করছেন। কিন্তু সেই স্বস্তিও ক্ষণস্থায়ী। চলমান দাবদাহের মধ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জনজীবনে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দিন ও রাতের একটা বড় সময় বিদ্যুৎহীনতায় স্থবির হয়ে পড়ছে মানুষের জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম। বিশেষ করে পল্লী অঞ্চলে এই সংকটের তীব্রতা নগর এলাকার তুলনায় অনেক বেশি। স্থানভেদে ৮-১০ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না।

বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশজুড়ে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিংয়ের আশ্রয় নিতে হচ্ছে। বিভিন্ন জেলা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অঞ্চলভেদে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে। কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও শিক্ষা কার্যক্রমও এই বিদ্যুৎ সংকটের ফলে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুতের এই ঘাটতি মোকাবেলায় চলতি মাসের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রমের সূচিতে পরিবর্তন এনে সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন ও তিন দিন অফলাইনে ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়।

এপ্রিল মাসেই বিদ্যুৎ সরবরাহের এমন করুণ দশায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। আসন্ন মে ও জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে পরিস্থিতির আরও অবনতি আশঙ্কা করছেন তারা। পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের পরিসংখ্যান বলছে, গতকাল রাত ১টায় দেশে বিদ্যুতের সম্ভাব্য চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে ১৩ হাজার ১৯৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ছিল ২ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি। জ্বালানি সংকট ও যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতায় বিদ্যুৎব্যবস্থা বর্তমানে প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে। পিক আওয়ারে নিরবচ্ছিন্ন ১৫ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন ধরে রাখা বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য এখন এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিল্প ও উৎপাদনে ধাক্কা

সম্প্রতি লোডশেডিং সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে শিল্পখাতে। গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, স্টিল, সিরামিকসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় কারখানাগুলোকে নির্ধারিত সময়ের বাইরে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে, ফলে বাড়ছে খরচ। অনেক ক্ষেত্রে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা জ্বালানি ব্যয়ের কারণে উৎপাদন খরচ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও হুমকির মুখে পড়ছে।

দেশের শিল্প এলাকা গাজীপুরের স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সেখানে চাহিদার ৪৮৫ মেগাওয়াট বিদ্যুতের বিপরীতে সরবরাহ ছিল ৩৪৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ এই অঞ্চলে লোডশেডিং হয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ। সাভারে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। কোনো কোনো দিন লোডশেডিং ৪৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সাভারে ট্যানারি সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে তারা পশুর চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে পারছেন না।

ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা

লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। বিদ্যুৎ না থাকলে দোকানপাট, শপিংমল, রেস্টুরেন্ট- ক্রেতার উপস্থিতি কমে যায় সবখানেই। কারণ গরমে কেউই কোনো দোকান বা রেস্টুরেন্টে ঢুকে বসতে চায় না।

কৃষিতে বিপর্যয়ের শঙ্কা

বর্তমানে দেশের সেচনির্ভর কৃষিতে বিদ্যুতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লোডশেডিংয়ের কারণে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, বিশেষ করে চলমান বোরো মৌসুমে এর প্রভাব মারাত্মক হতে পারে। সময়মতো পানি না পেয়ে ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলবে।

শিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব

গতকাল থেকে দেশব্যাপী শুরু হয়েছে এসএসসি পরীক্ষা। পরীক্ষার্থীদের জন্য এই লোডশেডিং বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াশোনা, পরীক্ষার প্রস্তুতি, অনলাইন ক্লাস সবকিছুই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতির কারণে।

টেলিকম ও সেবাখাতে সমস্যা

দেশে ৪৬ হাজারের বেশি টেলিকম টাওয়ার ও ২৭টি ডেটা সেন্টার ১৮ কোটির বেশি গ্রাহককে সেবা দিচ্ছে। এখন টেলিযোগাযোগ খাতও লোডশেডিংয়ের ধাক্কা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। মোবাইল টাওয়ারগুলো দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকলে সেবা ব্যাহত হয়। ফলে দেখা দিচ্ছে কল ড্রপ, ইন্টারনেটের ধীর গতির কারণে সেবা পেতে পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। ব্যাংকিং, এটিএম সেবা এবং অন্যান্য ডিজিটাল সেবাও বিঘ্নিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে।

কেন বাড়ছে লোডশেডিং?

পেট্রোবাংলা গত রোববার বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পিডিবিকে ৯২ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে, যেখানে ন্যূনতম চাহিদা ছিল ১০০ কোটি ঘনফুট। সেদিনের হিসাবে কয়লার স্বল্পতায় ৬১২ মেগাওয়াট, গ্যাস ও তেলের ঘাটতিতে প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট এবং রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ১ হাজার ৮১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ ছিল। ফলে মোট ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মেগাওয়াট, যা দেশের প্রয়োজনীয় চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এ পরিস্থিতি লোডশেডিং বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ।

একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রের আংশিক ও পূর্ণ বন্ধ থাকা সংকটকে আরও তীব্র করেছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ৯টি এবং খুলনা অঞ্চলের ১০টির মধ্যে ৬টি কেন্দ্র বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। তীব্র গরমে চাহিদা বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতির ফলে আমদানিতে ঘাটতি এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক জ্বলানী মজুদ করে সময়মত সাপ্লাই না দেওয়া- এ সকল বিষয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এর সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণজনিত বন্ধ থাকাও জনভোগান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হওয়ায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তারা আশ্বাস দিচ্ছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি এবং জ্বালানীর আমদানি বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এছাড়া নির্ধারিত সময়সূচির মাধ্যমে লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

এই লোডশেডিংয়ের ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জে যখন ২৪ ঘন্টায় ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে, তখন প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় তাদের জীবন অসহনীয় হয়ে উঠছে। শিশু, বয়স্ক এবং অসুস্থদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। বর্তমান লোডশেডিং পরিস্থিতি শুধু সাময়িক অসুবিধা নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, উৎপাদন এবং জনজীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও তীব্র হতে পারে।

This post was viewed: 10

আরো পড়ুন