Ridge Bangla

ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন আফগানিস্তানের বাগরাম বিমান ঘাঁটি ফেরত চান?

বেশ হঠাৎ করেই আলোচনায় এসেছে আফগানিস্তানের বাগরাম বিমান ঘাঁটি। ডোনাল্ড ট্রাম্প এটি চেয়ে বসেছেন, সাথে না দিলে যে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে সেটিরও ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন তার সোশ্যাল মিডিয়া বার্তায়। ​এই বিমান ঘাঁটি ছিল একসময় আফগানিস্তানের মার্কিন সামরিক অপারেশনের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর থেকে তা আলোচনার বাইরে ছিল। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি এই ঘাঁটি ফিরে পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে পুনরায় একে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন। কিন্তু কেন ট্রাম্প তাদের সাবেক এই ঘাঁটিকে আবার নিজেদের দখলে ফিরিয়ে আনতে চাইছেন?

​​বাগরাম বিমান ঘাঁটি শুধু একটি সামরিক স্থাপনা নয়, এটি আফগানিস্তানের সামরিক ইতিহাসের একটি প্রতীক। এটি ১৯৫০-এর দশকে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় নির্মিত হয়েছিল এবং ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের সময় এটিই ছিল তাদের প্রধান বিমান ঘাঁটি। অর্থাৎ এই ঘাঁটি নির্মাণ হয়েছিল সোভিয়েত আমলে। আফগান মুজাহিদিনদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার সামরিক অভিযান এখান থেকেই পরিচালিত হয়েছিল। পরবর্তীতে, ২০০১ সালে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী এর নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং একে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও কৌশলগত সামরিক কেন্দ্রে পরিণত করে।

​যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে বাগরাম পরিণত হয়েছিল একটি ছোট সামরিক শহরে। এটি প্রায় ৭৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং এতে ছিল দুটি দীর্ঘ রানওয়ে, যার একটিতে বোমারু ও কার্গো বিমানের মতো বিশাল সামরিক বিমানও ওঠা-নামা করতে পারতো।

এটি শুধু একটি বিমানঘাঁটিই ছিল না, এর ভেতরে ছিল ব্যারাক, রেস্তোরাঁ, হাসপাতাল, দোকানপাট, এমনকি জিমও। এটি ছিল আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর প্রধান সরবরাহ ও লজিস্টিক হাব। এর ভেতরে একটি বিশাল কারাগারও ছিল, যা আল-কায়েদা ও তালেবান সদস্যদের আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ব্যবহৃত হতো। আন্তর্জাতিকভাবে এটি ‘আফগানিস্তানের গুয়ানতানামো’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

​​ডোনাল্ড ট্রাম্প বাগরাম ঘাঁটি ফেরত পাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। ট্রাম্পের মতে, বাগরাম ঘাঁটি চীনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির স্থান থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত।

তিনি বলেছেন, “আমরা ওই ঘাঁটি ফেরত চাই। চীন যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, বিমানঘাঁটিটির অবস্থান ওই জায়গা থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে।” এর মাধ্যমে তিনি মূলত চীনের পারমাণবিক সক্ষমতা পর্যবেক্ষণের জন্য বাগরামের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরতে চেয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের দ্রুত পারমাণবিক শক্তিবৃদ্ধি ওয়াশিংটনে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী বাগরাম ঘাঁটি চীনের ওপর নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অপরিহার্য।

​এছাড়াও ট্রাম্প বারবার অভিযোগ করেছেন যে জো বাইডেন প্রশাসন কোনো চুক্তি ছাড়াই এই গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিটি তালেবানের কাছে ছেড়ে দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ভুল ছিল। তিনি মনে করেন, তালেবান সরকারের কাছ থেকে বাগরাম ফেরত নেওয়া সম্ভব। এর কারণ হচ্ছে সফলভাবে টিকে থাকতে হলে তালেবানদের যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন। অর্থাৎ আফগানিস্তানকে এই ঘাঁটির বিনিময়ে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে।

​বাগরাম ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ফিরে এলে আমেরিকা বেশ কিছু কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। প্রথমত, এটি মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব পুনরুদ্ধারের একটি বড় সুযোগ করে দেবে। এই অঞ্চলটি বিভিন্ন প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ, যার মধ্যে একটি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ খনিজ তেল। চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় বাগরাম একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হতে পারে। চীন মধ্য এশিয়ায় ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে, এবং বাগরাম ঘাঁটি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে।

আবার বাগরাম ঘাঁটি আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট (আইএস-কে) এবং অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করার জন্য একটি শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারবে। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দূরবর্তী স্থান থেকে ড্রোন হামলা চালিয়ে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে, বাগরামের মতো একটি শক্তিশালী ঘাঁটি হাতে থাকলে দ্রুত এবং সরাসরি সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো সম্ভব হবে। এর পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাগরামের মাধ্যমে আমেরিকা ইরানের ওপরও কৌশলগত চাপ বজায় রাখতে পারবে। গত কয়েক বছরে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে। বাগরামের ভৌগোলিক অবস্থান ইরানকে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য একটি সুবিধাজনক স্থান হতে পারে।

​কিন্তু বাগরাম ঘাঁটি পুনরায় দখল করার ক্ষেত্রে ঝুঁকি এবং চ্যালেঞ্জও কম নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা মনে করেন, এটি একটি বিশাল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। ঘাঁটিটি আবার কার্যকর করতে ১০ হাজারের বেশি সৈন্য এবং আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করতে হবে, যা আফগানিস্তানে নতুন করে একটি মার্কিন আগ্রাসনের মতো মনে হতে পারে। তালেবান সরকার এরই মধ্যে বাগরাম ফেরত দেওয়ার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছে। প্রাক্তন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের মতে, ঘাঁটিটির সামরিক গুরুত্বকে ট্রাম্প যতটা বাড়িয়ে বলছেন, বাস্তবে তার চেয়ে কম। ঝুঁকি ও খরচ বিবেচনা করলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লাভজনক নাও হতে পারে। তাছাড়া, এটি তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে এবং এই অঞ্চলে নতুন করে সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।

তথ্যসূত্র

১) Why Trump has again demanded control over Afghanistan’s Bagram air base

২) Why Does Trump Want U.S. Troops Back in Afghanistan?

৩) Why Trump wants a Taliban air base back

This post was viewed: 28

আরো পড়ুন