Ridge Bangla

দ্বিতীয় বল্কান যুদ্ধ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অশনিসঙ্কেত

উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং বিংশ শতকের প্রথমদিকে বল্কান অঞ্চলে উন্মেষ ঘটেছিল জাতীয়তাবাদী চেতনার। ধুঁকতে থাকা উসমানী সালতানাত তখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল, কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই তাদের বিরুদ্ধে চলে যায়। সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বল্কান অঞ্চলে সৃষ্টি হয় চূড়ান্ত অস্থিতিশীলতার।

প্রেক্ষাপট

আঞ্চলিক আধিপত্য এবং জাতিগত বিভেদের সূত্রে সূচনা হয় প্রথম বল্কান যুদ্ধের। ১৯১২ থেকে ১৯১৩ সালের মে, মোটামুটি সাত মাসের মতো ছিল এর স্থায়িত্ব। বল্কান লীগের সদস্য বুলগেরিয়া, গ্রীস, সার্বিয়া এবং মন্টেনেগ্রোর সাথে লড়াই হয় উসমানী সালতানাতের। প্রতিপক্ষের উন্নত সমরাস্ত্র এবং আধুনিক রণকৌশলের কাছে পর্যুদস্ত হয় এককালের পরাক্রমশালী উসমানী সেনাবাহিনী।

লন্ডন চুক্তি ইতি টানে প্রাথমিক সহিংসতার। ইউরোপে উসমানী সাম্রাজ্য হারায় প্রায় আশি শতাংশ ভূমি, যেটা ভাগাভাগি করে নেয় বল্কান লীগ। আদ্রিয়ানোপোল দখল করে নেয় বুলগেরিয়া।

তবে লন্ডন চুক্তি যুদ্ধের মূল কারণগুলোর সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে প্রায় সাথে সাথেই বল্কান লীগের বিভক্তি পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। উসমানীদের বিরুদ্ধে তারা একজোট হয়েছিল বটে, কিন্তু প্রত্যেকেরই ছিল আলাদা হিসাব নিকাশ। সেখানে বুলগেরিয়া বেশ গোস্বা হয়েছিল, কারণ তাদের মনে হয়েছিল যে জমি তারা পেয়েছে সেটা অকিঞ্চিৎকর।

বুলগেরিয়ার তৎকালীন রাজা ছিলেন প্রথম ফার্দিন্যান্দ (Ferdinand I)। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রতিশ্রুত এলাকা থেকে তার দেশকে বঞ্চিত করা হয়েছে। নতুন আরেকটি লড়াই অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। তৎকালীন পরাশক্তি-যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সবাই তখন বল্কানে প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী। তাই দূর থেকে ঘটনাপ্রবাহে ইন্ধন যোগাতে থাকে তারা।

প্রথম বল্কান যুদ্ধ শেষে আলবেনিয়া অধিকার করেছিল সার্বিয়ানরা। বুলগেরিয়া তাদের সমর্থন দেয়। কিন্তু পরাশক্তিগুলোর চাপে সেটা প্রত্যাহার করে নেন ফার্দিন্যান্দ। আলবেনিয়া শেষ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ওদিকে বুলগেরিয়ার আকাঙ্ক্ষিত অনেক এলাকা নিয়ে যায় সার্বিয়া, ফলে দুই দেশের মধ্যে তিক্ততা তৈরি হয়।

সংঘাতের সূচনা

সার্বিয়ানরা রণপ্রস্তুতি শুরু করে। বুলগেরিয়া অবশ্য যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী, কারণ তাদের সেনাবাহিনীর আকার সার্বিয়ার প্রায় দ্বিগুন। তদুপরি প্রশিক্ষণ আর অভিজ্ঞতায়ও এগিয়ে বুলগেরিয়ান সেনারা। তবে ছক জটিল হয়ে ওঠে যখন গ্রীস আর সার্বিয়া গোপনে সামরিক সহযোগিতার চুক্তি করে। বুলগেরিয়ার জমি ভাগাভাগির বিশদ পরিকল্পনা চুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এমন সময় উত্তরদিকে রোমানিয়াও সীমান্ত নিয়ে বুলগেরিয়ার প্রতি আগ্রাসী হয়ে ওঠে।

বুলগেরিয়ানরা সেনা সমাবেশ করে। সার্বিয়ার সাথে মূল লড়াই হবে এমনটা ধরে কৌশল নির্ধারণ করেন তাদের সমরবিদেরা। এজন্য সেদিকেই অধিকাংশ সেনা মজুত করা হবে। কিন্তু যুদ্ধের শুরুতেই ভুল বুঝতে পারেন তারা, কারণ শত্রুরা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাদের। দক্ষিণে গ্রীস, উত্তরে রোমানিয়া এবং নতুন করে জেগে ওঠা উসমানীরা পূর্বদিক থেকে আক্রমণ করে বসে।

লড়াই

১৯১৩ সালের ২৯ জুন আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে আরম্ভ হয় সংঘর্ষ। মেসিডোনিয়া বরাবরই নিজেদের বলে দাবি করতো বুলগেরিয়া, কিন্তু সেখানে অবস্থান করছিল গ্রীক আর সার্বিয়ান সেনারা। তাদের ওপর প্রথম আঘাত আসে। প্রায় এক লাখ বুলগেরিয়ান সৈনিক আক্রমণ করে তাদের ওপর। গ্রীস আর সার্বিয়া মূল ব্যুহ ধরে রেখেছিল, তবে বুলগেরিয়া কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ গেভজেলিজা (Gevgelija) শহর দখল করে নেয়। এর ফলে দুই বল্কান মিত্রের বাহিনীকে ভাগ করে ফেলতে সক্ষম হয় তারা।

পরবর্তী কয়েক মাসে সার্বিয়ানদের সাথে রক্তক্ষয়ী বেশ কিছু লড়াইয়ে লিপ্ত হয় বুলগেরিয়ানরা। ব্রেগালনিকা (Bregalnica) আর কালিমাঞ্চির (Kalimanci) যুদ্ধ এর অন্যতম। দুই জায়গাতেই বহু হতাহত ফেলে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয় ফার্দিন্যান্দের লোকেরা। তবে মেসিডোনিয়ার উত্তরাঞ্চলে বেশ কিছু জয় পায় তারা। ফলে সার্বিয়া আর বুলগেরিয়ার মধ্যে সৃষ্টি হয় অচলাবস্থা।

মেসিডোনিয়ার দক্ষিণে ছিল গ্রীসের রাজা প্রথম কন্সট্যান্টিনের বাহিনী (Constantine I)। কিলকিস শহর নিয়ে বুলগেরিয়ানদের সাথে ভয়ঙ্কর সংঘাতে বিজয়ী হন তিনি। এরপর এজিয়ান সাগরের দিকে তাদের যাবার রাস্তা বন্ধ করে ঘাঁটি করে গ্রীকরা। কন্সট্যান্টাইনের মুহুর্মুহু আক্রমণে বিপর্যস্ত বুলগেরিয়া আরো পেছাতে থাকে। একপর্যায়ে বল্কানের দক্ষিণাঞ্চল থেকে সরে যেতে বাধ্য হয় তাদের সেনারা। রসদপত্রের স্বল্পতায় এরপর হামলা বন্ধ করতে হয় গ্রীকদের।

বুলগেরিয়ার উত্তর আর পূর্ব সীমান্ত তখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত। এই সুবর্ণ সুযোগ হেলায় হারাতে রাজি ছিল না রোমানিয়া আর উসমানী সালতানাত। রোমানিয়ানরা প্রথম বল্কান যুদ্ধ থেকে তেমন লাভ করতে পারেনি, সুতরাং বুলগেরিয়ার কিছু জমিজমার প্রতি লোভ ছিল তাদের। আর উসমানীদের মূল লক্ষ্য আদ্রিয়ানোপোল পুনরুদ্ধার।

রোমানিয়ান সেনারা প্রায় বিনা বাধায় প্রবেশ করে বুলগেরিয়ার অভ্যন্তরে। বিচ্ছিন্ন কিছু লড়াইয়ের পর রাজধানী সোফিয়ার অনতিদূরে এসে উপস্থিত হয় তারা। ভীত বুলগেরিয়া দ্রুত অন্য ফ্রন্ট থেকে ডেকে পাঠায় সেনাদের।

উসমানীরাও ততদিনে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। প্রথম বল্কান যুদ্ধে এশিয়া আর আফ্রিকার ইউনিটগুলো অংশ নিতে পারেনি। দ্বিতীয় যুদ্ধের আগে তারা বসফোরাস অতিক্রম করে মূল দলের সাথে যোগ দিয়েছে। এই বাহিনী আদ্রিয়ানোপোল থেকে স্বল্প সংখ্যক বুলগেরিয়ান সেনাদের হটিয়ে দেয়। অন্যান্য বেশ কিছু এলাকাও ফিরিয়ে নেয় তারা।

সমাপ্তি

চারদিক থেকে মার খেয়ে অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব দেন ফার্দিন্যান্দ। পরাশক্তিগুলোও মিট্মাট করে নেবার জন্য সব পক্ষের ওপর চাপ দেয়। ১৯১৩ সালের ১০ আগস্ট আলাদা আলাদা দুটো চুক্তির মাধ্যমে শেষ ঘটে যুদ্ধের। বুলগেরিয়ার সাথে বল্কান দেশগুলোর বুখারেস্ট চুক্তি (Treaty of Bucharest) পূর্ববর্তী লন্ডন চুক্তিকে প্রতিস্থাপিত করে। গ্রীস, সার্বিয়া, রোমানিয়া আর মন্টেনেগ্রো প্রত্যেকেই বুলগেরিয়ার কিছু না কিছু এলাকা পায়। উসমানীদের সাথে কন্সট্যান্টিনোপোল (Treaty of Constantinople) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২৯ সেপ্টেম্বর। আদ্রিয়ানোপোল ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার ওপর থেকে দাবি উঠিয়ে নেয় বুলগেরিয়া।

দ্বিতীয় বল্কান যুদ্ধও এই অঞ্চলে শান্তি আনতে পারেনি। সার্বিয়ানদের প্রতি আরো বিরূপ হয়ে ওঠে বুলগেরিয়া। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা (Bosnia and Herzegovina) নিয়ে নতুন করে শুরু হয় দুই পক্ষের চাপান-উতোর। অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রিত এই এলাকায় জাতীয়তাবাদ উস্কে দিতে দুজনেই ঢালতে থাকে অর্থ ও লোকবল। এই সূত্রে সারায়েভোতে হত্যা করা হয় অস্ট্রো-হাঙ্গেরির ভাবী সম্রাট, আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্দ (Archduke Franz Ferdinand) ও তার স্ত্রীকে। আততায়ী ছিল উগ্র সার্ব জাতীয়তাবাদী দলের সদস্য। আগুনে ঘি পড়ে এই ঘটনায়। পরাশক্তিগুলো দ্রুতই জড়িয়ে পরে সংঘাতে, সূচনা হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের।

References
This post was viewed: 40

আরো পড়ুন