Ridge Bangla

রয়েল বেঙ্গল টাইগার: বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে জাতীয় ঐতিহ্য 

বাংলাদেশের গর্ব ও বন্য প্রকৃতির অনন্য প্রতীক রয়েল বেঙ্গল টাইগার আজ বিলুপ্তির শঙ্কায়। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বুকে যে দীর্ঘদিন ধরে রাজত্ব করে আসছে, সেই বাঘ আজ হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, বন ধ্বংস, চোরা শিকার এবং সরকারি উদাসীনতা মিলিয়ে এ দুর্দশার সৃষ্টি হয়েছে।

গবেষকরা সতর্ক করেছেন- যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ২০৭০ সালের মধ্যে সুন্দরবন থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এটি শুধুমাত্র একটি প্রাণীর বিলুপ্তি নয়, বরং বাংলাদেশে একটি জটিল বাস্তুতন্ত্র ও সংস্কৃতি ধ্বংসেরও পূর্বাভাস।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে, যা সুন্দরবনের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলেছে। সুন্দরবনের প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র কয়েক ফুট উঁচুতে অবস্থিত। ২০১০ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি ১১ ইঞ্চি বাড়ে, তাহলে বাঘের সংখ্যা ৯৬ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাঘের টিকে থাকাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

বাঘ সংরক্ষণের পথে প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো চোরা শিকার। আন্তর্জাতিক বাজারে বাঘের চামড়া, দাঁত ও হাড়ের চড়া দাম থাকায় এ নিষ্ঠুরতা বেড়েই চলেছে। একটি পূর্ণবয়স্ক বাঘের চামড়া ২৫-৩০ লাখ টাকায় বিক্রি হয় বলে জানা গেছে। এই আর্থিক প্রলোভনে পড়ে চোরা শিকারিরা প্রতিনিয়ত সুন্দরবনের গহীনে ঢুকে প্রাণঘাতী ফাঁদ পেতে রাখছে। তদুপরি, বনবিভাগের দুর্বল নজরদারি, অপ্রতুল জনবল ও দুর্নীতিগ্রস্ত কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে এই অনাচার দিনের পর দিন চলেই যাচ্ছে।

বাঘের জীবনধারণের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ এলাকা প্রয়োজন, যেটি প্রতিনিয়ত সংকুচিত হচ্ছে। শিল্পায়ন, নতুন রাস্তা নির্মাণ, বন উজাড়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ নানা কারণে সুন্দরবনের গভীর অঞ্চলেও এখন মানুষের পদচারণা বাড়ছে। এতে শুধু বাঘ নয়, হরিণ, বানর, কুমিরসহ বহু বন্যপ্রাণীও তাদের নিরাপদ আবাস হারাচ্ছে।

বাঘের আবাসস্থল ধ্বংস মানেই পুরো ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। বাঘ না থাকলে হরিণের সংখ্যা বেড়ে যাবে, যা গাছপালা খেয়ে বন ধ্বংস করে দেবে। এর ফলস্বরূপ, গোটা সুন্দরবনের পরিবেশ ব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে।

বাঘ রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ থাকলেও, তার বাস্তবায়নে রয়েছে বড় ধরনের ঘাটতি। ২০০০ সালে ঘোষিত ‘টাইগার প্রজেক্ট সুন্দরবন’ আজও পুরোদমে চালু হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ধীরগতি, বাজেট ঘাটতি ও দুর্নীতি সংরক্ষণ উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এ ছাড়াও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোনো সংরক্ষণ কর্মসূচি সফল হতে পারে না। অথচ তাদের সচেতন করা, বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ এখনো পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

সবকিছুর মাঝেও কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১৪টিতে। এটি ইঙ্গিত দেয়, সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাঘ সংরক্ষণ সম্ভব।

সরকারও কিছু প্রাথমিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যেমন- লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসল চাষ, ঝড় প্রতিরোধক বাঁধ নির্মাণ, এবং দ্বীপগুলোর উচ্চতা বৃদ্ধি ইত্যাদি। এসব পদক্ষেপ সুন্দরবনের টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে।

রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণে প্রয়োজন একটি সমন্বিত, কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ। প্রথমত, চোরা শিকার প্রতিরোধে কড়া আইন প্রয়োগ এবং বনরক্ষীদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সুন্দরবনের ভেতরে ও সংলগ্ন এলাকায় বসবাসরত মানুষদের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তারা বনের ওপর নির্ভর না করে। তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে বাঘ রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।

চতুর্থত, সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বহুজাতিক কোম্পানি ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। পঞ্চমত, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় বাংলাদেশকে আরও জোরালো কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে হবে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার আমাদের জাতীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধুমাত্র একটি প্রাণী নয়, বরং একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু। বিজ্ঞানী বিল লরেন্স সঠিকভাবেই বলেছেন, “সুন্দরবনের মতো এমন জায়গা পৃথিবীতে আর নেই।” তাই বাঘকে বাঁচাতে হলে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমকেই রক্ষা করতে হবে।

এই দুর্মূল্য প্রাণীকে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত দায়িত্ব। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন সুন্দরবনের ঘন জঙ্গলে হরিণ তাড়া করা একটি বাঘের ছায়া দেখতে পায়, সেজন্য আজ থেকেই আমাদের ঐক্যবদ্ধ ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তাহলে হয়তো রয়েল বেঙ্গল টাইগার আবারও গর্জন তুলবে, যেমনটি সে যুগ যুগ ধরে করে এসেছে।

রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণে আবাসস্থল রক্ষা, চোরা শিকার বন্ধ এবং বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব হ্রাসের ওপর জোর দিতে হবে। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার, লবণাক্ততা সহিষ্ণু গাছ রোপণ, নিরাপত্তা টহল বৃদ্ধি, স্থানীয়দের সচেতন করা এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা জরুরি। বাঘের খাদ্য ও প্রজননের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে। নিয়ন্ত্রিত পর্যটন চালু করে বাঘের পরিবেশে ব্যাঘাত এড়াতে হবে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তা গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে সম্মিলিত উদ্যোগ নিলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার সংরক্ষণ এবং তাদের টিকে থাকা নিশ্চিত করা সম্ভব।

This post was viewed: 16

আরো পড়ুন