Ridge Bangla

ইন্দোনেশিয়ার অভ্যুত্থানমুখী আন্দোলন

২০২৫ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহ। ইন্দোনেশিয়ার পার্লামেন্টে হঠাৎ করেই ঘোষণা এলো, সংসদ সদস্যদের নতুন ভাতা বৃদ্ধির পরিকল্পনার কথা। ৫৮০ জন পার্লামেন্ট সদস্যের জন্য মাসিক ভাতা হিসেবে ৫০ মিলিয়ন রুপিয়াহ (প্রায় ৩ হাজার মার্কিন ডলার) বৃদ্ধি করা হবে। সংখ্যাটি শুনে সাধারণ মানুষের চোখ কপালে। কারণ, এই ভাতা ছিল গড়ে এক সাধারণ নাগরিকের মাসিক আয়ের দশ-বারো গুণ। দেশের মানুষ যেখানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে সংসদ সদস্যদের এমন অস্বাভাবিক সুবিধা যেন সবার ক্ষোভকে জোরালোভাবে বিস্ফোরিত করে তুলল।

অবস্থা আরও জটিল হয়ে ওঠে, যখন জাকার্তার বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গাড়িচাপায় নিহত হন ২০ বছর বয়সী মোটরবাইক চালক আফফান কুর্নিয়াওয়ান। তিনি আইনপ্রণেতাদের আর্থিক সুবিধার বিরুদ্ধে এক সমাবেশে অংশ নিয়েছিলেন। এই ঘটনা শুধু আন্দোলনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গই নয়, বরং গোটা জাতির ক্ষোভকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছে।

প্রথমে জাকার্তায় সীমাবদ্ধ থাকা আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিম জাভা, বালি, লোম্বক ও সুলাওয়েসি পর্যন্ত। বরাবরের মতো শিক্ষার্থীরা ছিল আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি। বিশ্ববিদ্যালয় ফেডারেশন BEM SI নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়ায়। নারীরাও আন্দোলনে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। Indonesian Women’s Alliance (IWA) সংসদের সামনে গোলাপি ফিতা আর ঝাড়ু হাতে দাঁড়িয়ে দুর্নীতি ছাঁটাই করার প্রতীকী বার্তা দেয়। শ্রমিক ও নাগরিক সমাজ দ্রুত একাত্মতা প্রকাশ করে এই আন্দোলনে। রাস্তায় নেমে আসে ট্রাক চালক, শিক্ষক, দোকানদার সবাই। কিছুদিনের মধ্যেই এই প্রতিবাদ পরিণত হয় সরকারবিরোধী এক আন্দোলনে।

আন্দোলন যেন ছড়িয়ে না পড়ে, সেই শঙ্কায় সরকার সংসদ সদস্যদের ভাতা কিছুটা কমায়। কিন্তু জনগণের দাবি, এ কেবল লোক দেখানো ধাপ্পাবাজি। সেজন্য তারা সেটা প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে আন্দোলনকারীরা প্রকাশ করে একটি কাঠামো, যা “১৭+৮ ডিমান্ডাস” নামে পরিচিতি পায়। এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল: সংসদ সদস্যদের অস্বাভাবিক ভাতা ও সুবিধা বাতিল, দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন ক্ষমতা দেওয়া, খাদ্য ও জ্বালানি মূল্যের নিয়ন্ত্রণ, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থী ও তরুণদের জন্য সমান সুযোগ, ন্যায্য শ্রমনীতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কার। এই দাবিগুলো আন্দোলনকে রাজনৈতিক সংস্কারের আন্দোলনে রূপ দেয়।

আন্দোলন যত জোরালো হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া ততই কঠোর হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এখনো অন্তত ১০ জন নিহত, শতাধিক আহত, এবং ২০ জনের বেশি নিখোঁজ রয়েছে। অভিযোগ আছে, নিখোঁজ হওয়া অনেককেই গোপনে আটক করা হয়েছে। গ্রেপ্তারও হয়েছে তিন হাজারের অধিক মানুষ। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু সরকারি ভবনে ক্ষতিসাধন হয়েছে। সংসদ সদস্যদের বাড়ি, এমনকি অর্থমন্ত্রী শ্রী মুলিয়ানি ইন্দ্রাওয়াতির  বাড়িও লুটপাট করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর বাড়ির লুটপাট সম্পন্ন হয়েছে দুই ধাপে।

প্রথম ধাপে কয়েক ডজন মোটরসাইকেলে চড়ে লোক এসে হামলা চালায়, এরপর দ্বিতীয় দফায় বাড়িতে ঢুকে প্রায় দেড় শতাধিক মানুষ। তারা বাসা থেকে একটি টেলিভিশন, সাউন্ড সিস্টেম, ড্রইংরুমের আসবাবপত্র, কাপড়চোপড়, প্লেট ও বাটি নিয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনতারার খবরে বলা হয়েছে, এ সময় অর্থমন্ত্রী শ্রী মুলিয়ানি বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না। ঘটনাস্থলে উপস্থিত দুই প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্যের ভিত্তিতে এ খবর প্রকাশ করা হয়। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সুরাবায়াতে বিক্ষোভকারীরা গভর্নরের অফিসের সামনে যানবাহনে আগুন ধরিয়ে দেয়। শুধু তা-ই নয়, মাকাসার, সোলো, যোগ জাকার্তা, মেদানসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে দাবানলের মতো।

প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তোর সরকার প্রথমে বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখলেও আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নিলে তিনি কঠোর দমননীতি গ্রহণ করে। এজন্য জাকার্তায় ও অন্যান্য বড় শহরে ৭০ হাজার সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুনরায় সক্রিয় করা হয় বিতর্কিত মিলিশিয়া ‘পাম সকার্সা’। ধরপাকরও বাড়ানো হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, অনেককে বিনা কারণে আটক করে রাখা হয়েছে। একদিকে সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার ইঙ্গিত দিলেও অপরদিকে কঠোর বলপ্রয়োগ করায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে উঠছে।

নারী সংগঠনগুলোর অংশগ্রহণ এই আন্দোলনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ঝাড়ু হাতে নারী কর্মীদের সংসদের সামনে দাঁড়ানোর দৃশ্য ইতোমধ্যেই দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে। তাদের দাবি, শুধু অর্থনৈতিক সংস্কার নয়, বরং লিঙ্গ সমতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনও চাই।

আন্দোলনের খবর ছড়িয়ে পড়েছে সীমান্ত পেরিয়ে। মালয়েশিয়ায় অনেকে খাবার অর্ডার দিয়ে ইন্দোনেশিয়ান ডেলিভারি চালকদের সমর্থন জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো কঠোর দমননীতির নিন্দা জানিয়েছে। বিদেশি সংবাদমাধ্যম আন্দোলনকে “ইন্দোনেশিয়ার গণতন্ত্রের জন্য নতুন পরীক্ষা” হিসেবে দেখছে।

আন্দোলন থামার কোনো লক্ষণ নেই। প্রতিদিন নতুন স্লোগান, নতুন মিছিল, নতুন মুখ যোগ দিচ্ছে। সরকার আলোচনার ডাক দিচ্ছে, কিন্তু জনগণের আস্থা ফিরছে না।

সংসদ সদস্যদের ভাতা বৃদ্ধির মতো আপাত ছোট্ট এক ইস্যু থেকে শুরু হওয়া এ আন্দোলন আজ রূপ নিয়েছে দুর্নীতি, বৈষম্য ও রাজনৈতিক অবিচারের বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক লড়াইয়ে। আফফান কুর্নিয়াওয়ানের মৃত্যু, নারীদের ঝাড়ু হাতে রাস্তায় নামা, ছাত্রদের সাহসী মিছিল, সব মিলিয়ে এই আন্দোলন এখন ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।

ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। কিন্তু একটি বার্তা স্পষ্ট হয়ে উঠে এসেছে, “মানুষের ক্ষোভ আর ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষা কখনো দমন করা যায় না”।

Source:
  1. Indonesia protests explained
  2. From tragedy to reform: Rethinking democracy and public ethics in Indonesia
  3. Rights group says 10 killed in Indonesia protests
  4. Indonesia fires police officer over killing that fuelled protests
  5. Indonesian student protesters meet ministers, set out complaints
This post was viewed: 23

আরো পড়ুন