Ridge Bangla

ইসরায়েলের গুপ্তচরবৃত্তি কৌশল: কীভাবে মোসাদ ইরানের ক্ষমতা কাঠামোতে অনুপ্রবেশ করে

মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান ও ইসরায়েল বহু দশক ধরেই এক গভীর ও বিপজ্জনক ‘ছায়া যুদ্ধে’ লিপ্ত। এখানে কেউই একে অপরকে সরাসরি হামলা করছে না, কিন্তু নানান পদ্ধতিতে ক্ষতি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অনবরত। তাদের এই সংঘাতের অন্যতম প্রধান কৌশল হলো ইসরায়েলের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ (Mossad) কর্তৃক ইরানের সামরিক, পরমাণু এবং রাজনৈতিক পরিমন্ডলের গভীরে অনুপ্রবেশ। ইসরায়েলি গোয়েন্দা কার্যক্রমের লক্ষ্য শুধু তথ্য সংগ্রহ নয়৷ বরং তারা চেষ্টায় থাকে কিভাবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মাধ্যমে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে তেহরানের স্থিতিশীলতা ও সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করে দেওয়া যায়।

​মোসাদের অনুপ্রবেশ কৌশল মূলত দুটি প্রধান ক্ষেত্রকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়৷ একটি হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ডেটা সেন্টারের দখল নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আয়োজন সম্পন্ন করা এবং আরেকটি হলো উচ্চপ্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের নিজেদের বলয়ে টেনে নেয়া। সাম্প্রতিক সময়ে গুপ্তচরদের ধরার পর ফাঁসির ঘটনাগুলোতে দেখা গেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা প্রায়শই উচ্চ পর্যায়ের টেলিযোগাযোগ বা ইলেকট্রনিক ডিভাইস আমদানির পথের সাথে জড়িত ছিল। ইরানের বিচার বিভাগের মতে, মোসাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ডেটাবেস হস্তগত করা এবং ইরানের ডেটা সেন্টারগুলোতে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে নিরাপত্তা বলয়ে ফাটল সৃষ্টি করা।

মোসাদ সাধারণত সরাসরি ইসরায়েলি এজেন্টদের (Kidon) ইরানের ভেতরে পাঠায় না। তারা ইরানি নাগরিক বা তৃতীয় কোনো দেশের নাগরিকদের নিয়োগ করার মাধ্যমে এই কাজ করে। প্রাক্তন মোসাদ প্রধান ইয়েসি কোহেনও এক সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ইরানের অতি গোপনীয় পরমাণু আর্কাইভ চুরির মতো জটিল অভিযানে অংশ নেওয়া এজেন্টদের মধ্যে কেউই ইসরায়েলি নাগরিক ছিলেন না। এজেন্টদের নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সাধারণত বিদেশ ভ্রমণ, অর্থনৈতিক প্রলোভন, উন্নত চিকিৎসা বা পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ব্যবহার করে সম্পন্ন করা হয়। অর্থনৈতিক চাপ ও বিভিন্ন কারণে সৃষ্ট অসন্তোষের কারণে ইরানের প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ কর্মীরা প্রায়শই মোসাদের প্রলোভনের শিকার হন।

​গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করার ক্ষেত্রে মোসাদ কেবল তথ্য চুরি করেই থেমে থাকে না, তারা সরাসরি হত্যাকাণ্ড বা নাশকতার মতো গোপন অভিযানও পরিচালনা করে। ইরানের এক ডজনেরও বেশি পরমাণু বিজ্ঞানীর মৃত্যু সেদিকেই ইঙ্গিত দেয়। ইরানের পরমাণু বিজ্ঞানীরা, বিশেষত মহসেন ফখরিজাদেহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের হত্যাকাণ্ড মোসাদের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কের গভীর অনুপ্রবেশের ফল।

ইরানের ভেতরেই অবস্থান করা মোসাদ এজেন্টরা এই বিজ্ঞানীদের ব্যক্তিগত তথ্য, বসবাসের স্থান এবং গতিবিধির ওপর নজর রাখতেন। সাম্প্রতিক সংঘাতেও ইসরায়েলি সামরিক বিমানগুলি পারমাণবিক বিজ্ঞানী ও সামরিক কমান্ডারদের বেডরুম লক্ষ্য করে নির্ভুলভাবে হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছিল৷ এর দ্বারা বোঝা যায় মোসাদের গুপ্তচরবৃত্তির নেটওয়ার্ক কত গভীরে চলে গিয়েছে।

​মোসাদ প্রায়শই উচ্চ-পদস্থ সামরিক নেতাদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য সাইবার প্রতারণার আশ্রয় নেয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ইসরায়েল একটি অপারেশনের সময় তাদের শত্রুপক্ষের সামরিক নেতাদের একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে ‘জরুরি বৈঠকের’ মিথ্যা বার্তা পাঠিয়েছিল, যা পরবর্তীকালে নির্ভুল বিমান হামলায় ধ্বংস হয়। এটি প্রমাণ করে যে মোসাদ শুধু প্রযুক্তিগত অনুপ্রবেশ নয়, বরং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। এমনকি ইরানের নিজস্ব গোয়েন্দা বা নিরাপত্তা সংস্থায় মোসাদের ডাবল এজেন্টের উপস্থিতি নিয়েও চাঞ্চল্যকর দাবি উঠেছে। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ একবার দাবি করেছিলেন যে ইসরায়েল-বিরোধী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত ইরানের প্রধান গোয়েন্দা ইউনিটের প্রধান নিজেই মোসাদের এজেন্ট ছিলেন।

​মোসাদের এই অভিযানগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সাইকোলজিক্যাল ওয়েলফেয়ার (Psychological Warfare)। মোসাদ পরিকল্পিতভাবে প্রচার করে যে ইরানের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে তারা ড্রোন ও অন্যান্য সরঞ্জামের মাধ্যমে ইরানের সবকিছু নখদর্পনে রেখেছে। এই ধরনের তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে ইসরায়েল ইরানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে এই ভয় ঢুকিয়ে দিতে চায় যে, ইরানের কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক নেতা ইসরায়েলের পরবর্তী হামলার লক্ষ্য হতে পারেন। এই মানসিক উদ্বেগ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বে অবিশ্বাস ও সন্দেহ সৃষ্টি করে, যা তাদের সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।

​পরিশেষে বলা যায়, ইরানের ক্ষমতা কাঠামোর অভ্যন্তরে ইসরায়েলের অনুপ্রবেশ দেশটিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে দেয়। ইরানের যেকোনো পরিকল্পনা সম্পর্কে ইসরায়েল আগেভাগে জেনে ফেললে সে অনুযায়ী পাল্টা পরিকল্পনা সাজায় তারা। এছাড়া প্রায়ই এই গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়, যাতে করে সামরিক ও বেসামরিক নেতৃত্বের মধ্যে বিভেদ তৈরি হয়। এর মূল লক্ষ্য থাকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ও স্থিতিশীলতাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেওয়া।

তথ্যসূত্র

১) How extensive are Israel’s intelligence operations inside Iran?

২) The Shadow War: How Israel’s Mossad Infiltrated Iran’s Security Apparatus

৩) How Mossad’s network of agents helped Israel strike inside Iran

This post was viewed: 25

আরো পড়ুন