Ridge Bangla

পানি কূটনীতি ও বাংলাদেশ-ভারতের পানিবণ্টন সংকট

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সংগ্রাম করাই যেন বাংলাদেশের নিয়তি। প্রতিবছর ঘটে যাওয়া বন্যা সে বাস্তবতাকে সামনে এনে দেয়। এই বিপর্যয়ের পেছনে প্রকৃতির খামখেয়াল তো আছেই, কিন্তু এর পাশাপাশি ভারতের কার্যকলাপ নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজাররিকও বলেছেন, ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পানির স্রোতই বাংলাদেশের হঠাৎ বন্যার মূল কারণ। পানি শুধু জীবনের প্রয়োজনে নয়, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষত বাংলাদেশ ও ভারতের মতো প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে, যেখানে ৫৪টি অভিন্ন নদী দুই দেশের ভূখণ্ড অতিক্রম করে প্রবাহিত হয়, সেখানে পানিকে ঘিরে দ্বন্দ্ব, সহযোগিতা ও কূটনীতির জটিল সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান নদীমাতৃক দেশ হলেও এর বেশিরভাগ নদীর উৎপত্তি স্থলই ভারত। ফলে ভারতের পানি ব্যবস্থাপনার ওপর বাংলাদেশের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি বিপুলভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, পানি নিয়ে সহযোগিতার চেয়ে দ্বন্দ্বই প্রকট হয়েছে বেশি, যার অন্যতম কারণ হলো পানি নিয়ে বৈষম্যমূলক আচরণ এবং সমন্বিত কূটনৈতিক কাঠামোর অভাব।

পানি নিয়ে দ্বন্দ্ব: ইতিহাস ও বাস্তবতা

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার পানিবণ্টন সংকট নতুন কিছু নয়। এটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে ১৯৭৪ সালে, যখন ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর গঙ্গার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়। এতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেয়।

দীর্ঘ আলোচনার পর ১৯৯৬ সালে ৩০ বছর মেয়াদী একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কার পানির একটি নির্দিষ্ট অংশ বাংলাদেশকে দিতে ভারতকে বাধ্য করে। এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হবে। তবে, সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষার সময় হঠাৎ অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেওয়া এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় পানি আটকে রাখার অভিযোগ নিয়মিতই ওঠে ভারতের বিরুদ্ধে।

তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আলোচনাও চার দশক ধরে ঝুলে আছে। ২০১১ সালে একটি চুক্তির খসড়া প্রায় চূড়ান্ত হলেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। যার ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পানির অভাবে কৃষি ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এখন পর্যন্ত বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো কার্যকর হয়নি বা হয়েছে ভারতের একতরফা সুবিধার ভিত্তিতে। যৌথ নদী কমিশন এবং গঙ্গা পানি চুক্তি উভয়ই বাংলাদেশের জন্য কাঙ্ক্ষিত সুফল আনতে পারেনি। যৌথ নদী কমিশনের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ ভারতের রাজনৈতিক অনীহা, কিন্তু পাশাপাশি বাংলাদেশের কৌশলগত ও কূটনৈতিক দুর্বলতাও এর পেছনে দায়ী।

ভারতের অনীহা ও অকার্যকারিতার কারণে অতীতে বাংলাদেশ তিস্তা নদীর জলধারা নিয়ন্ত্রণে চীনের প্রস্তাব বিবেচনা করেছিল। কিন্তু ভারতের আপত্তি ও রাজনৈতিক বিবেচনায় সেটি পরে বাতিল হয়ে যায়। এতদিন যেভাবে রাজনৈতিক প্রভাবেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গতি নির্ধারিত হয়েছে, এখন সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ভিত্তি করেই সম্পর্ক পুনর্গঠন করা দরকার। ভারতের বুঝে নেওয়া উচিত, বাংলাদেশ চিরকাল অপেক্ষা করে থাকবে না। একতরফা বন্ধুত্বে বারবার প্রতারিত হয়ে অবশেষে বাংলাদেশ বিকল্প পথ খুঁজে নিতে বাধ্য হতেই পারে।

বাংলাদেশ ও ভারত পানিসংকটের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। দুই দেশ ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি ভাগ করে নেয়। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক নদী থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত কেবল একটি মাত্র নদী নিয়ে ১৯৯৬ সালে একটি চুক্তি হয়েছে। সেটি হলো গঙ্গা। বাকি নদীগুলোর জন্য এখনো কোনও সমঝোতা বা আইনি কাঠামো তৈরি হয়নি। ভারত একতরফাভাবে বিভিন্ন সীমান্তবর্তী নদীতে বাঁধ নির্মাণ বা পানি প্রত্যাহারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশে কখনো খরার প্রকোপ বাড়ছে, আবার কখনো হঠাৎ বন্যায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে।

পানি কূটনীতি: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

পানিকূটনীতি বা Water Diplomacy মূলত সেই নীতি ও পদ্ধতির সমষ্টি, যার মাধ্যমে বিভিন্ন রাষ্ট্র জলসম্পদের যৌথ ব্যবস্থাপনা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আলোচনায় বসে। এই কূটনীতির লক্ষ্য হলো আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি স্থিতিশীল সমাধানে পৌঁছানো।

আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো

১৯৯৭ সালের United Nations Convention on the Law of the Non-Navigational Uses of International Watercourses অনুযায়ী, অভিন্ন নদীগুলোর ব্যবস্থাপনায় ‘Equity’ ও ‘No Significant Harm’ নীতির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে ভারত এই কনভেনশন এখনো স্বাক্ষর করেনি। ফলে আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সুরক্ষাও বাংলাদেশ পায় না। গঙ্গা চুক্তির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, চুক্তিটি বাস্তবায়নে কোনো বাধ্যতামূলক সালিশি বা আইনি ব্যবস্থার ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে ভারত যখন ইচ্ছামতো চুক্তির ব্যত্যয় ঘটায়, তখন বাংলাদেশ কার্যকর কোনো প্রতিকার পায় না।

আঞ্চলিক স্বার্থ বনাম দ্বিপাক্ষিক সমাধান

দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ক্ষেত্রে বারবারই দেখা গেছে, ভারতের রাজ্য সরকারগুলোর আপত্তি কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কূটনীতিকে ব্যাহত করে। পশ্চিমবঙ্গের আপত্তিতে যেমন তিস্তা চুক্তি আটকে আছে, তেমনই মেঘনা অববাহিকার অন্য নদীগুলোর ক্ষেত্রেও রাজ্য স্বার্থ বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে একটি আঞ্চলিক কাঠামোর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, যেখানে শুধু ভারত-বাংলাদেশ নয়, বরং ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার অন্যান্য দেশগুলো (যেমন চীন, ভুটান ও নেপাল)-কেও অন্তর্ভুক্ত করে একধরনের “রিভার বেসিন ম্যানেজমেন্ট কাউন্সিল” গঠন করা যেতে পারে।

সমাধানের পথে সুপারিশ

ভারতের সাথে বাংলাদেশের অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে বৈচিত্র্যময় ও বাস্তবে উপযোগী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

১. জাতিসংঘ পানি সম্মেলন বাস্তবায়ন:

প্রথম দক্ষিণ এশীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ২০২৫ সালের ২০–২৩ জুন ‘জাতিসংঘ পানি সম্মেলন’-এ যোগদান করেছে। এর ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, ট্রান্সপারেন্ট ডাটা এক্সচেঞ্জ, ইকুইটেবল ইউজ, নো সিগনিফিক্যান্ট হার্ম নীতি প্রয়োগ করা সম্ভব। ইউএন কনভেনশন অন দ্য ল’ অফ দ্য নন-নেভিগেশনাল ইউসেস অফ ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটারকোর্সেস-এর নবম অনুচ্ছে অনুযায়ী, পানির পরিমাণ, মান, পূর্বাভাস ইত্যাদি নিয়মিত বিনিময় নিশ্চিত করা উচিত।

২. প্রযুক্তিগত ও পরিবেশ সংরক্ষণ উদ্যোগ:

দ্বিপাক্ষিক বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা ও রিয়েল-টাইম ডাটা শেয়ারিং সিস্টেম প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে, যাতে তথ্য দ্রুত আদান‑প্রদান করা যায় এবং পূর্বসতর্কতা গ্রহণযোগ্য হয়। সিঙ্গাপুর ও বেঙ্গালুরু’র বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এবং পুনঃব্যবহার পদ্ধতি অনুসরণ করে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ জলসঞ্চয় ব্যবস্থা শক্তিশালী করা যেতে পারে।

৩. নদী পুনরুদ্ধার, ড্রেজিং ও দূষণ নিয়ন্ত্রণ: গঙ্গা–মেঘনা–ব্রহ্মপুত্রের পরিবেশগত আদর্শ রক্ষা করা আবশ্যিক।

৪. দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তিমূলক কাঠামো শক্তিশালীকরণ:

১৯৯৬-এর গঙ্গা জলবণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হতে চলেছে। এর পুনর্মূল্যায়ন ও সংশোধনের ব্যাপারে প্রস্তুতি প্রয়োজন। তিস্তা নদীতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়ায় শীতকালীন বাংলাদেশের কৃষিতে বড় ধাক্কা পড়ছে। এটি দ্রুত চূড়ান্ত করা জরুরি।

একটি যৌথ অববাহিকাভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করার প্রস্তাব করা যেতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো, একটি নদী এবং তার সম্পূর্ণ অববাহিকার (যেমন মেকং নদী) অন্তর্গত দেশগুলো যেন একসাথে কাজ করতে পারে। এই কাঠামোর মাধ্যমে পানির সুষ্ঠু বণ্টন, নদীর উপর বিভিন্ন কার্যক্রমের পরিবেশগত প্রভাব পর্যবেক্ষণ এবং জলবিদ্যুৎ থেকে প্রাপ্ত আয়ের অংশীদারিত্ব সম্ভব হবে।

কুশিয়ারা ও ফেনী নদীর মতো ছোট নদীগুলোর ক্ষেত্রে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বর্তমানে যে সমঝোতা স্মারক রয়েছে, সেগুলোকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করার উপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি, ভবিষ্যতে প্রয়োজনে অন্যান্য ছোট নদীর ক্ষেত্রেও এই ধরনের সমঝোতা করতে হবে।

৪. তৃতীয়‑পক্ষ:

বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির মতো নিরপেক্ষ সংগঠন দিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা সম্ভব, যেমনটা, সিন্ধু চুক্তির ক্ষেত্রে হয়েছে। তিস্তা, ধরলা, গোমতি ইত্যাদি নদীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার পথ গ্রহণ করতে পারে।

৫. জনগণ ও নাগরিকদের অংশগ্রহণ:

সীমান্তবর্তী অঞ্চলের কৃষক, জেলে, স্থানীয় প্রশাসন, বিজ্ঞানী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত সভার আয়োজন করে “ক্রস-বর্ডার কমিউনিটি ফোরাম” গঠন করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার পানিবণ্টন সংকট কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং মানবিক একটি চ্যালেঞ্জও বটে। এ সংকট সমাধানে কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক, বিজ্ঞাননির্ভর এবং ন্যায্যতা-প্রসূত কূটনৈতিক কাঠামো।

যদি বাংলাদেশ ও ভারত তাদের অভিন্ন স্বার্থকে সামনে রেখে একটি টেকসই ও দায়বদ্ধ পানিবণ্টন ব্যবস্থায় একমত হতে পারে, তাহলে শুধু দুই দেশের মধ্যে নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় নদীকেন্দ্রিক শান্তি, উন্নয়ন ও আস্থার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

Source:
  1. India and Bangladesh Conflict Over the Ganges River
  2. India-Bangladesh dispute over the Teesta River. Menga
  3. Teesta River Dispute between India and Bangladesh …
  4. India-Bangladesh Water Dispute: Why a New Approach is …
  5. Water Diplomacy and Water sharing problem between Bangladesh and India: a Quest for Solution
This post was viewed: 30

আরো পড়ুন