Ridge Bangla

কোটা আন্দোলনের সূচনা থেকে সরকার পতন: ইতিহাস বদলে দেওয়া জুলাইয়ের প্রথম দিন

আজ ১ জুলাই। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি শুধু একটি আন্দোলনের সূচনাদিবস নয়; এটি এমন এক ধারাবাহিক ঘটনার শুরু, যা অল্প সময়ের মধ্যে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবি থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা, জবাবদিহি, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশব্যাপী প্রশ্নে রূপ নেয়।

২০২৪ সালের ১ জুলাই শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত টানা ৩৬ দিনের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশ থেকে পলায়নের ঘটনায় পৌঁছায়।

তবে এই ইতিহাসকে বুঝতে হলে একে শুধু “কোটা আন্দোলন” বলে সীমাবদ্ধ রাখলে পুরো চিত্র ধরা যায় না। এর শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে নিয়োগব্যবস্থার ন্যায্যতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে। পরে সংঘর্ষ, প্রাণহানি, দমন-পীড়ন, ইন্টারনেট বন্ধ, গ্রেপ্তার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আন্দোলনের চরিত্র দ্রুত বদলে যায়। একপর্যায়ে এটি কোটা সংস্কারের সীমানা ছাড়িয়ে সরকারবিরোধী ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে পরিণত হয়।

পটভূমি: ২০১৮ সালের আন্দোলন থেকে ২০২৪ সালের সংকট

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে বিতর্ক নতুন ছিল না। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের বড় আন্দোলনের মুখে সরকার নবম থেকে ত্রয়োদশ গ্রেডের সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে। সেই সময় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত কোটাসহ বিভিন্ন শ্রেণিভিত্তিক কোটা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক তৈরি হয়।

কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ জুন হাইকোর্ট ২০১৮ সালের সেই পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এর ফলে সরকারি চাকরিতে কোটার পুরনো কাঠামো পুনর্বহালের পথ তৈরি হয়। বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত ৩০ শতাংশ কোটা। শিক্ষার্থীদের বড় অংশের অভিযোগ ছিল, চাকরির বাজারে সীমিত সুযোগের মধ্যে এত বড় অংশ কোটার আওতায় থাকলে মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের প্রতিনিধিরা একে স্বাধীনতা সংগ্রামে অবদানের স্বীকৃতি ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দেখতেন।

এই বিতর্কের মধ্যে শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ছিল কোটা পুরোপুরি বাতিল নয়; বরং যৌক্তিক ও সীমিত সংস্কার। তারা চাইছিলেন মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত হোক এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ থাকলেও সেটি যেন যুক্তিসঙ্গত কাঠামোর মধ্যে থাকে।

১ জুলাই: নতুন প্ল্যাটফর্মে নতুন পর্যায়ের শুরু

হাইকোর্টের রায়ের পর জুন মাসজুড়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সরকারকে সময় বেধে দিয়েছিলেন। দাবি পূরণ না হওয়ায় ১ জুলাই থেকে আন্দোলন দেশব্যাপী নতুন রূপ নেয়।

এই সময় শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ নামে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে সংগঠিত হন। আন্দোলনের ভাষা ছিল পরিষ্কার- সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা কাঠামো সংস্কার করতে হবে এবং নিয়োগে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রথম পর্যায়ে সমাবেশ, মিছিল, গণপদযাত্রা, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন এবং প্রতীকী প্রতিবাদ ছিল প্রধান কর্মসূচি।

আন্দোলনের এই পর্যায় ছিল মূলত শান্তিপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কর্মসূচি থেকে দ্রুত সড়ক ও জনপরিসরে চলে আসেন। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই দাবিতে কর্মসূচি ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন সংগঠনের ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে; দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান, কর্মসূচি প্রচার এবং বিভিন্ন ক্যাম্পাসের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যম হয়ে ওঠে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো।

বাংলা ব্লকেড: আন্দোলনের দৃশ্যমান শক্তি

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে আন্দোলন আরও সংগঠিত ও দৃশ্যমান রূপ নেয়। ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়, মহাসড়ক এবং বিভিন্ন জেলায় যোগাযোগব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান নেন।

৭ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন শহরে সড়ক অবরোধ, মহাসড়ক অবরোধ ও রেলপথে অবস্থানের ঘটনা ঘটে। এতে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং আন্দোলনের ব্যাপকতা জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।

এই সময় আন্দোলনকারীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচিও দেন। তাদের বক্তব্য ছিল, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রমে ফিরবেন না। সরকার প্রথমদিকে বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বলে উল্লেখ করলেও আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, সরকার চাইলে আইনি ও নীতিগতভাবে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিতে পারে।

১০ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়ের ওপর স্থিতাবস্থা জারি করেন। এতে তাৎক্ষণিকভাবে পুরনো কোটা কাঠামো কার্যকর হওয়ার বিষয়টি স্থগিত থাকে। কিন্তু আন্দোলন থেমে যায়নি। কারণ তত দিনে আন্দোলন শুধু আদালতের আদেশের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না; শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার সংকট, প্রশাসনিক আচরণ এবং বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের অভিযোগ আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়।

উত্তেজনা, সংঘর্ষ এবং আন্দোলনের মোড় ঘোরা

জুলাইয়ের মাঝামাঝি এসে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বলাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ আরও বাড়ে।

পরদিন বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারীদের উপর আওয়ামী সরকারের পেটোয়া ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা নির্দয় হামলা চালায়। প্রতিরোধ গড়ে তোলে আন্দোলনকারীরাও। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা ও পরবর্তী তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ জুলাইয়ের পর আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতা ও দমনমূলক পরিস্থিতি দ্রুত তীব্র হয়।

১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের গতিপথ বদলে দেয়। তাঁর মৃত্যুর ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা আন্দোলনের ভেতরে ক্ষোভ ও শোককে আরও গভীর করে।

একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে আরও মানুষের মৃত্যুর খবর আসে। এরপর আন্দোলন আর শুধু চাকরির কোটার প্রশ্নে সীমিত থাকেনি; এটি রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ, নাগরিক নিরাপত্তা এবং জবাবদিহির প্রশ্নে পরিণত হতে শুরু করে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তি প্রয়োগ, নির্বিচার গ্রেপ্তার, গুলি, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। সরকার তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনা মোতায়েন, কারফিউ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং ইন্টারনেট সেবা ব্ল্যাকআউটের মতো পদক্ষেপ নেয়।

সরকারের পক্ষ থেকে সহিংসতার জন্য উসকানি, নাশকতা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তৎপরতার অভিযোগ তোলা হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে।

সুপ্রিম কোর্টের রায়: দাবি আংশিক পূরণ, কিন্তু আন্দোলন থামেনি

২১ জুলাই আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে সরকারি চাকরিতে নতুন কোটা কাঠামো নির্ধারণ করেন। আদালতের রায় অনুযায়ী, ৯৩ শতাংশ নিয়োগ মেধার ভিত্তিতে হবে। পাঁচ শতাংশ সংরক্ষিত থাকবে মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য; এক শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য এবং এক শতাংশ প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জন্য রাখা হয়।

আইনগতভাবে এটি ছিল শিক্ষার্থীদের মূল দাবির বড় অংশের প্রতিফলন। কিন্তু তখন পর্যন্ত পরিস্থিতি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। আন্দোলনের প্রধান দাবি ধীরে ধীরে বদলে যায়। নিহতদের হত্যার বিচার, গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি, আহতদের চিকিৎসা, ক্যাম্পাসে হামলার বিচার এবং দমন-পীড়নের জবাবদিহিতার প্রশ্ন সামনে আসে, যেগুলো মোটেও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না।

আন্দোলনের সমন্বয়কারীদের কয়েকজনকে গোয়েন্দা হেফাজতে নেওয়া এবং তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। আন্দোলনকারীরা অভিযোগ করেন, তাঁদের কর্মসূচি প্রত্যাহারে বাধ্য করার চেষ্টা হয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও আটক, নির্যাতন ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

কোটা সংস্কার থেকে এক দফা আন্দোলন

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে আন্দোলনের ভাষা ও লক্ষ্য আমূল বদলে যায়। নিহতদের স্মরণ, বিচারের দাবি এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের অভিযোগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন আবারও মাঠে ফিরে আসে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর দমনমূলক অবস্থান বজায় রাখলেও আন্দোলনে দেশবাসীর সম্পৃক্ততা বাড়তেই থাকে।

আগস্টের শুরুতে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ এক দফা দাবি ঘোষণা করে- তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর মন্ত্রিসভার পদত্যাগ। এখানেই কোটা সংস্কার আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপান্তরিত হয়।

৪ আগস্ট দেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যাপক সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। পরদিন ৫ আগস্ট ঢাকামুখী কর্মসূচির মধ্যে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং হেলিকপ্টারে চড়ে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে চলে যান। সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণে তাঁর পদত্যাগের কথা জানান এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।

পহেলা জুলাইকে তাই কেবল কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রথম দিন বলা যাবে না। এটি ছিল তরুণদের সংগঠিত প্রতিবাদের এমন এক সূচনাদিবস, যা রাষ্ট্র, রাজনীতি, কর্মসংস্থান, নাগরিক অধিকার ও জবাবদিহির প্রশ্নকে একই স্রোতে নিয়ে আসে।

কর্মসংস্থানের ন্যায্যতা নিয়ে একটি শিক্ষার্থীভিত্তিক দাবি কীভাবে বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে- তা দেখিয়ে দিয়েছে এই আন্দোলন। একই সঙ্গে এটি মনে করিয়ে দেয়, শান্তিপূর্ণ দাবিকে সময়মতো সংলাপ, ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত এবং মানবিক আচরণের মাধ্যমে সমাধান না করলে রাষ্ট্রীয় সংকট কত দ্রুত গভীর হতে পারে।

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন