মুসলিম সম্প্রদায়কে নিয়ে দেওয়া বিতর্কিত বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের মন্তব্যের জেরে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘এনাফ ইজ এনাফ। হুমায়ুন কবীরদের মতো ব্যক্তিদের শিক্ষা দেয়ার সময় এসেছে। এ ধরনের কথা বলার আগে ২৫ বার ভাববেন।’
জানা গেছে, সম্প্রতি আম জনতা উন্নয়ন পার্টির বিধায়ক হুমায়ুন কবীর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে উদ্দেশ করে একটি বিতর্কিত বক্তব্য দেন। এ নিয়ে সোমবার (২৯ জুন) পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ‘পয়েন্ট অব অর্ডার’ উত্থাপন করেন বিজেপি বিধায়ক উৎপল ব্রহ্মচারী। তিনি দাবি করেন, রেজিনগরের এক জনসভায় হুমায়ুন কবীর যে বক্তব্য দিয়েছেন, সে বিষয়ে সরকারের অবস্থান জানানো উচিত।
বিষয়টি আমলে নিয়ে স্পিকার রথীন বসু পরিষদীয় মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষকে বক্তব্য দেওয়ার নির্দেশ দেন। পরে তিনি জানান, এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই বক্তব্য রাখবেন।
এরপর বিধানসভায় বক্তব্য দিতে উঠে শুভেন্দু অধিকারী ২৬ তারিখ রেজিনগরের কাশীপুরে আয়োজিত জনসভায় হুমায়ুন কবীরের দেওয়া বক্তব্য তুলে ধরেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হুমায়ুন কবীর সেখানে বলেন, ‘আমি যেদিন মুসলমানদের নিয়ে মাঠে নেমে যাব, সেদিন এমন সাটা ভাঙা মার শুরু হবে যে আপনাদের পতাকা বহন করার লোক থাকবে না। লাখে লাখে মানুষকে রাস্তায় নামাব। এসপি বুঝব না, চিফ মিনিস্টারও বুঝব না। আমি নিজেই নেতৃত্ব দেব।’
মুখ্যমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, শক্তিপুরের দুয়ারাঘাটে আরেকটি সভায় হুমায়ুন কবীর এক পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে বলেন, প্রয়োজন হলে ১০ হাজার মানুষ নিয়ে থানা ঘেরাও করে তাকে গলা ধরে বের করে আনবেন।
এসব বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘আমরা রেজিনগরে ২টি এফআইআর করেছি। হুমায়ুন কবীরদের মতো মানুষদের শিক্ষা দেয়ার সময় এসেছে। এত বড় ক্ষমতা আপনাকে কেউ দেয়নি। আমি জানি আপনি কেন এসব করছেন। ভরতপুর ও রেজিনগরের পঞ্চায়েতগুলো নিজের দখলে নিতে পারেননি। তাই ৭২ শতাংশ মুসলিম ভোট নিজের দিকে টানতেই এসব বক্তব্য দিচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কান খুলে শুনে রাখুন, এ ধরনের লাগামহীন বক্তব্য আমি বলতে দেব না। ভারতের আইনই শেষ কথা বলে, কোনও ব্যক্তির হুমকি নয়। এ ধরনের কথা বলার আগে ২৫ বার ভাববেন, আমি হুঁশিয়ারি দিচ্ছি।’
একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দেন, ‘এটাই হুমায়ুন কবীরের শেষ বক্তব্য হবে। যারা তাকে অনুষ্ঠানে ডেকেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। এক সপ্তাহের মধ্যেই আমি মুর্শিদাবাদে যাব।’
এদিন বিধানসভায় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দায়িত্বে থাকা মুখ্যমন্ত্রী ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অব অ্যান্টি-সোশ্যাল অ্যাক্টিভিটিস বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করবেন বলেও জানানো হয়।
অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্যের জবাবে হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আইনের পথেই সব চলবে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়, আমিও নই। সিপিএম আমলে আমার বিরুদ্ধে ২৭টি এবং তৃণমূল আমলে ৬০টি মামলা হয়েছিল। কোনও মামলাতেই প্রমাণ হয়নি আমি গুন্ডাগিরি, তোলাবাজি বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করেছি। এই সরকারও তা প্রমাণ করতে পারবে বলে মনে করি না। বিচারব্যবস্থার ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।’
এ বিষয়ে বিরোধী দলের নেতা নওশাদ সিদ্দিকীও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘হুমায়ুন কবীর সাহেব যেভাবে মুসলমানদের এই বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, আমি তার বিরোধিতা করছি। কেউ যদি আপত্তিকর বক্তব্য দেন- তিনি যোগী আদিত্যনাথ হোন, হুমায়ুন কবীর হোন বা অন্য যে-ই হোন, আমি সেই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নই।’
উল্লেখ্য, গত শুক্রবার মুর্শিদাবাদের রেজিনগরের কাশীপুরে এক জনসভায় হুমায়ুন কবীর অভিযোগ করেন, নির্বাচনে পরাজয়ের পরও কয়েকজন বিজেপি নেতা এলাকায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। সেই প্রসঙ্গেই তিনি মুসলিম সম্প্রদায়কে একজোট হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে মামলা হলেও তিনি ভয় পান না বলেও মন্তব্য করেন।
পরে শক্তিপুরের আরেকটি জনসভায় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে তিনি আরও কড়া বক্তব্য দেন। ভোটের আগে তার ভাইপোকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, প্রয়োজন হলে হাজার হাজার মানুষ নিয়ে থানায় গিয়ে ওই কর্মকর্তাকে বের করে আনতে পারেন।