যুক্তরাষ্ট্রের মুসলিম ও কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকারভিত্তিক সংগঠন নেশন অব ইসলামের দীর্ঘদিনের নেতা লুই ফারাখানের স্ত্রী খাদিজা ফারাখান মারা গেছেন। গত ২৭ জুন ৯০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই এ তথ্য জানিয়েছে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী বুধবার এবং পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শিকাগোর মারিয়াম মসজিদে তার মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। আগামী শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় একই মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
নেশন অব ইসলামের অনুসারীদের কাছে তিনি ‘মাদার খাদিজা’ নামে পরিচিত ছিলেন। কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর আত্মনির্ভরশীলতার দর্শনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই সংগঠনের বিকাশ ও নেতৃত্ব গঠনে তিনি সাত দশকেরও বেশি সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
নেশন অব ইসলামের শুরা এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল এক বিবৃতিতে জানায়, ‘আল্লাহর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সম্মানিত নেতা লুই ফারাখান গভীর শোকের সঙ্গে আপনাদের অবহিত করছেন, তার ৭২ বছরের জীবনসঙ্গী, নেশন অব ইসলামের ফার্স্ট লেডি মাদার খাদিজা আল্লাহর কাছে ফিরে গেছেন।’
শিকাগো শহরের দক্ষিণাংশে অবস্থিত মারিয়াম মসজিদ নেশন অব ইসলামের কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে পরিচিত। ফারাখান পরিবারের বসবাসও ওই এলাকাতেই।
খাদিজা ফারাখানের আগের নাম ছিল বেটসি রস। ১৯৫৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বোস্টনে তিনি লুই ইউজিন ওয়ালকটকে বিয়ে করেন। পরবর্তীতে তার স্বামীর নাম হয় লুই ফারাখান। ১৯৫৫ সালে খাদিজা ইসলাম গ্রহণ করেন। একই বছর তার স্বামী নেশন অব ইসলামে যোগ দেন, যা ম্যালকম এক্সের প্রভাবে নেওয়া সিদ্ধান্ত ছিল। তাদের সংসারে ৯ সন্তান রয়েছে।
১৯৯৭ সালে ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠিত মিলিয়ন উইমেন মার্চে বক্তব্য দিয়ে খাদিজা ফারাখান বিশেষ পরিচিতি পান। ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত মিলিয়ন ম্যান মার্চের দুই বছর পর আয়োজিত ওই সমাবেশে তিনি বলেন, ‘একটি জাতি তার নারীদের অবস্থানের চেয়ে বেশি উচ্চতায় উঠতে পারে না। আমরা নারীদের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। তবে এটাও ভুলে গেলে চলবে না, পুরুষ–নারী ও শিশু- সবাইকে নিয়ে আমাদের পরিবার হিসেবে এগিয়ে যেতে হবে।’
নেশন অব ইসলামের যাত্রা শুরু হয় ১৯৩০ সালে। সে সময় ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কর্মী ওয়ালেস ডি ফার্ড মুহাম্মদ যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট শহরের কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকায় প্রচার কার্যক্রম শুরু করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল নিপীড়িত কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা ও আত্মপরিচয়ের বোধ জাগিয়ে তোলা।
তিনি ইসলামের বিভিন্ন শিক্ষা ও মূল্যবোধকে কৃষ্ণাঙ্গদের অর্থনৈতিক আত্মনির্ভরশীলতার আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করেন এবং দাসত্বের ইতিহাস থেকে পাওয়া নাম-পরিচয় ও সামাজিক রীতিনীতি পরিত্যাগের আহ্বান জানান। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে তিনি একাধিকবার ডেট্রয়েট পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন এবং প্রাণনাশের হুমকির মুখেও পড়েন। পরে তিনি নিখোঁজ হন। এরপর তার শিষ্য এলিজা মুহাম্মদ সংগঠনের নেতৃত্ব গ্রহণ করে কার্যক্রম শিকাগোতে স্থানান্তর করেন।
এলিজা মুহাম্মদের নেতৃত্বে নেশন অব ইসলাম ছোট পরিসরের ধর্মীয় সমাবেশ থেকে ধীরে ধীরে স্বায়ত্তশাসিত স্কুল, সংবাদপত্র, খামার এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বিস্তৃত একটি সংগঠনে পরিণত হয়। ম্যালকম এক্সের মাধ্যমে সংগঠনটির আদর্শ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫২ সালে তার যোগদানের পর সদস্যসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং এক দশকের মধ্যে তা প্রায় ৩ লাখে পৌঁছায়।
১৯৬৪ সালে কিংবদন্তি মুষ্টিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী ইসলাম গ্রহণ করে নেশন অব ইসলামে যোগ দিলে সংগঠনটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
১৯৭৫ সালে এলিজা মুহাম্মদের মৃত্যুর পর তার ছেলে ওয়ালেস ডি. মুহাম্মদ সংগঠনটিকে সুন্নি ইসলামের ধারায় পরিচালনার উদ্যোগ নেন। তিনি কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদভিত্তিক সাংগঠনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অনেক অংশ পরিবর্তন করেন। তবে লুই ফারাখান এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। পরে ১৯৭৭ সালে তিনি আলাদা হয়ে শিকাগোতে নেশন অব ইসলামকে পুনর্গঠন করেন।