ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সব স্কুল ও মাদরাসায় ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড। তবে সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিকের সিদ্ধান্তগুলোর একটি হিসেবে রাজ্যের সব স্কুল ও মাদরাসায় ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করেন শুভেন্দু অধিকারী।
সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রাজ্যের সব স্কুল ও মাদরাসার সকালের সমাবেশে জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’-এর পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ গাইতে হবে।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড। সংগঠনটির দাবি, নির্দেশনাটি দ্রুত প্রত্যাহার করতে হবে অথবা অন্তত মুসলিম শিক্ষার্থীদের এর বাধ্যবাধকতা থেকে ছাড় দিতে হবে।
এক বিবৃতিতে বোর্ডের মুখপাত্র ড. এসকিউআর ইলিয়াস বলেন, কোনো শিক্ষার্থীকে তার ধর্মীয় বিশ্বাসের বিপরীত কোনো গান বা লেখা আবৃত্তি কিংবা গাইতে বাধ্য করা মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
অন্যদিকে সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, জাতীয় সংগীত গাওয়া সবার জন্য বাধ্যতামূলক থাকবে।
তিনি বলেন, ‘আপনি যদি এই দেশে থাকতে চান, তাহলে আপনাকে ‘বন্দে মাতরম’ এবং ‘জন গণ মন’ গাইতে হবে। ২৬ জানুয়ারি ও ১৫ আগস্টকে সম্মান করতে হবে।’
শুভেন্দু আরও বলেন, ‘প্রতিটি স্কুলে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটাই ভারতীয় সংস্কৃতি। এটাই সনাতন সংস্কৃতি। ভারত হিন্দুস্তান এবং ইন্ডিয়া- দুই নামেই পরিচিত। এই দেশ অন্য কারও হাতে যেতে পারে না।’
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুও। তিনি বলেন, ‘বন্দে মাতরম’ পুরো দেশের জাতীয় সংগীত। এটি শুধু আমার, আপনার, কোনও রাজ্য বা কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের নয়। এটি জাতীয় সংগীত। এ বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করার কোনও সুযোগ থাকা উচিত নয়।
এর আগে কংগ্রেস সংসদ সদস্য শশী থারুর সরকারি অনুষ্ঠানের শুরু ও শেষে ‘বন্দে মাতরম’-এর পাঁচটি স্তবক গাওয়া বাধ্যতামূলক করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
কেরালায় এ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সবাই ‘বন্দে মাতরম’-কে সম্মান করেন। তবে প্রতিটি অনুষ্ঠানে এর পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ বাধ্যতামূলক করার যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
শশী থারুর বলেন, ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় সংগীত এবং এটি গাওয়া হলে আমরা সম্মান জানিয়ে দাঁড়াই। প্রথম স্তবক বা প্রথম কয়েকটি লাইন অধিকাংশ মানুষেরই মুখস্থ।
তার মতে, আগে সাধারণত কোনো অনুষ্ঠানের শুরুতে একবার ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হতো এবং শেষে আলাদাভাবে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হতো।
তিনি বলেন, ‘এখন প্রতিটি অনুষ্ঠানের শুরুতে পাঁচটি স্তবক গাইতে হবে, আবার শেষে তা পুনরায় গাইতে হবে। আমি মনে করি এটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে চাপিয়ে দেয়া।’
প্রসঙ্গত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৭০-এর দশকে ‘বন্দে মাতরম’ রচনা করেন। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি ভারতের গণপরিষদ এটিকে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দেয়।
চলতি বছরের শুরুতে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সব সরকারি অনুষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’-এর আগে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার নির্দেশ দেয়। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, গানটির ছয়টি স্তবকই গাইতে হবে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশনের সময় উপস্থিত সবাইকে সতর্ক অবস্থায় দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে হবে।