Ridge Bangla

হাডুডু: গ্রামীণ বাংলার বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য

হাডুডু বা কাবাডি গ্রামীণ বাংলার এক প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খেলা, যা একসময় গ্রামের মানুষের আনন্দ-উৎসবের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল। এটি শুধু একটি খেলা নয়, বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

হাডুডু বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হিসেবে পরিচিত এবং উপমহাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া। বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে কাবাডি নামে পরিচিত এই খেলা দক্ষিণ এশিয়ান গেমসেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে গ্রামাঞ্চলে এটি এখনও হাডুডু নামেই বেশি পরিচিত।

একসময় বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রামে হাডুডুকে কেন্দ্র করে জমে উঠত উৎসবমুখর পরিবেশ। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, এমনকি বয়স্করাও মাঠে ভিড় জমাতেন এই খেলা উপভোগ করতে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার, ভিডিও গেম, মোবাইল ও টেলিভিশনের প্রভাবে ধীরে ধীরে এই ঐতিহ্যবাহী খেলা হারিয়ে যেতে বসেছে। আজ অনেক গ্রামে খোলা মাঠে হাডুডুর দেখা পাওয়া যায় না, যা একসময় ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গবেষক ও ক্রীড়া বিশেষজ্ঞদের মতে, হাডুডু শুধু বিনোদন নয়, এটি শারীরিক সক্ষমতা ও দলগত চেতনা গড়ে তোলে। অতীতে গ্রামের শিশু-কিশোররা পড়াশোনার পাশাপাশি বিকেলে দলবেঁধে এই খেলায় অংশ নিত। এখন সেই জায়গা দখল করেছে লুডো, ক্যারাম, মোবাইল গেম ও ক্রিকেট।

তবে আশার কথা হলো, কিছু এলাকায় এখনও এই খেলার ঐতিহ্য টিকে আছে। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় দীর্ঘ ১০৪ বছর ধরে নিয়মিত হাডুডু প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যা গ্রামীণ ক্রীড়া সংস্কৃতির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এসব আয়োজনে হাজারো দর্শকের উপস্থিতি প্রমাণ করে, এই খেলার প্রতি মানুষের আগ্রহ এখনও বিলুপ্ত হয়নি।

বাংলাদেশের মাননীয় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম মনে করেন, “হাডুডু একসময় মানুষের প্রাণের খেলা ছিল। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এটি আবার জনপ্রিয় হতে পারে।” তাঁর মতে, প্রতিটি ক্লাব ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই খেলা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইংল্যান্ডে যেমন ক্রিকেটকে পুনরুজ্জীবিত করতে মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তেমনি বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে হাডুডু ফিরিয়ে আনা সম্ভব। গ্রামীণ ক্রীড়া ফেডারেশন গঠন করলে নতুন প্রজন্ম এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে।

হাডুডু খেলার মাঠ সাধারণত ৪২ ফুট লম্বা ও ২৭ ফুট চওড়া হয়ে থাকে। প্রতি দলে ১২ জন খেলোয়াড় থাকলেও মাঠে ৭ জন অংশ নেয়। খেলায় দুই অর্ধে মোট ৪৫ মিনিট সময় থাকে এবং দম নিয়ে প্রতিপক্ষকে স্পর্শ করে ফিরে আসার মাধ্যমে পয়েন্ট অর্জন করা হয়। খেলার অন্যতম আকর্ষণ হলো দলগত কৌশল ও শারীরিক দক্ষতার সমন্বয়।

গ্রামীণ অঞ্চলে একসময় হাডুডুকে কেন্দ্র করে বসত মেলা ও উৎসব। পুটিজানা, কুশমাইল, ফুলবাড়ীয়া, বাক্তা, রাংগামাটিয়া, কালাদহসহ বিভিন্ন এলাকায় এ খেলা ছিল মানুষের বিনোদনের প্রধান উৎস। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক খেলোয়াড় খেপে খেলতে অন্য জেলায়ও যেতেন, যা তাদের জনপ্রিয়তা বাড়াত।

বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার কারণে এই ঐতিহ্যবাহী খেলা হারিয়ে যাওয়ার পথে। তবে ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক উদ্যোগ নিলে হাডুডু আবারও তার পুরনো গৌরব ফিরে পেতে পারে। গ্রামীণ সংস্কৃতি রক্ষায় হাডুডু শুধু একটি খেলা নয়, এটি একটি ঐতিহ্য, একটি ইতিহাস।

This post was viewed: 12

আরো পড়ুন