যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান উত্তেজনা নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনার পথ তৈরি করতে এক পাতার একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথমবারের মতো দুই পক্ষ সমঝোতার সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
মার্কিন প্রশাসন আশা করছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক সম্মতি মেলেনি, তবে কূটনৈতিক তৎপরতা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে উভয় পক্ষই একটি অন্তর্বর্তী সমাধানে পৌঁছাতে আগ্রহী।
প্রস্তাবিত সমঝোতার মূল শর্ত অনুযায়ী, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিভিন্ন দেশে জব্দ থাকা ইরানের বিপুল অঙ্কের সম্পদ মুক্ত করে দিতে রাজি হতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে উভয় পক্ষের আরোপিত নৌ-চলাচলসংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করার কথাও আলোচনায় রয়েছে।
তবে এই স্মারকের অধিকাংশ শর্তই একটি পূর্ণাঙ্গ চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আলোচনায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ার ঝুঁকিও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল এবং নেতৃত্বের মধ্যে মতপার্থক্য থাকায় ঐক্যমতে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
এই সমঝোতা স্মারককে কেন্দ্র করে ১৪ দফা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। এতে যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সঙ্গে ৩০ দিনের একটি সময়সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মধ্যে বিস্তারিত চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলবে। এই আলোচনা ইসলামাবাদ বা জেনেভায় অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানা গেছে।
এ সময়ের মধ্যে ধীরে ধীরে সামরিক উত্তেজনা কমানো হবে। ইরানের নৌ-চলাচলে বিধিনিষেধ শিথিল করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে আলোচনায় ব্যর্থতা এলে যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় কঠোর অবস্থানে ফিরে যেতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার সময়সীমা। ইরান যেখানে পাঁচ বছরের প্রস্তাব দিয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে দীর্ঘমেয়াদি, প্রায় ২০ বছরের স্থগিতাদেশ। শেষ পর্যন্ত এই সময়সীমা ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে নির্ধারিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া শর্ত লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা বাড়ানোর একটি ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে ওয়াশিংটন।
সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান প্রতিশ্রুতি দেবে যে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের আকস্মিক পরিদর্শনের অনুমতি দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে।
এদিকে, উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে, যা আগে ইরান প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই ইউরেনিয়াম অন্য দেশে বা যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।
সব মিলিয়ে, কূটনৈতিক এই প্রচেষ্টা সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা হ্রাস পেতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত চুক্তি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।