Ridge Bangla

ব্রোকেন পরিবারের সন্তান: মানসিক চাপে বেড়ে ওঠা অস্তিত্ব সংকটের গল্প

সমাজের চোখে একটি পরিবার মানেই নিরাপত্তা, ভালোবাসা ও মানসিক আশ্রয়ের প্রতীক। কিন্তু যখন সেই পরিবার কোনো দ্বন্দ্ব বা অস্থিরতার কারণে ভেঙে যায়, তখন সেটিকে বিবাহবিচ্ছেদ বলা হয়। আর এই বিচ্ছেদের গভীর প্রভাব পড়ে ওই সংসারে সন্তান থাকলে তাদের জীবনে।

শুরু থেকেই আমাদের এই অঞ্চলে পরিবারপ্রথা চলমান। আমাদের দেশে যৌথ পরিবার, একক পরিবার ও অণু পরিবারের মতো পরিবারব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। এরকম একটি পরিবারের মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে স্বামী-স্ত্রী বা ওই পরিবারের সন্তানদের মা-বাবাকে কেন্দ্র করে।

যখন কোনো কারণে একটি পরিবারে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে, তখন সেই পরিবারকে ব্রোকেন ফ্যামিলি বলা হয়। এই পরিবারের সন্তানরা হয় ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তান। মোদ্দাকথা, ব্রোকেন ফ্যামিলি মানে ভাঙা সংসার।

এই ব্রোকেন ফ্যামিলি শব্দটি শুধু একটি পারিবারিক অবস্থাকে নির্দেশ করে না, বরং এটি একধরনের মানসিক ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে শিশুরা বেড়ে ওঠে অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং অবহেলার মাঝে। এটি পরবর্তীতে গভীর প্রভাব ফেলে তাদের জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে।

ভাঙা পরিবারের সন্তানদের শৈশব সাধারণত স্থিতিশীল হয় না। বাবা-মায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিচ্ছেদ বা একে অন্যের থেকে আলাদা বসবাস সন্তানের মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্বামী-স্ত্রী আলাদা হয়ে যাওয়ার পর সন্তানরা কখনো মায়ের বাড়িতে, কখনো বাবার বাড়িতে থাকে- এমনটাই দেখা যায় আমাদের দেশে। এতে তারা প্রায়শই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। যেখানে একটি শিশুর শৈশবে বেড়ে ওঠার জন্য স্থিতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এই ধরনের অস্থিরতা তাদের একপ্রকার অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেয়।

কখনো কখনো একটা বয়সে এসে ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানরা নিজেদের দোষী ভাবতে শুরু করে। এ সময় তারা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, যা তাদের জীবনে ছোটখাট বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে দেয়। তারা এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে, কারও সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতেও সমস্যায় পড়ে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর প্রাথমিক বছরগুলোতে পারিবারিক পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে যদি তারা মা-বাবা উভয়কে পাশে না পায়, আর ভালোবাসা ও স্থিতিশীলতা অনুপস্থিত থাকে, তবে তা ভবিষ্যতে তাদের আচরণ, শিক্ষা ও সামাজিক জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে এখনও পরিবারকে একটি ঐক্যবদ্ধ কাঠামো হিসেবে দেখা হয়। ফলে ভাঙা পরিবারের সন্তানরা বেশিরভাগ সময় সামাজিকভাবে অবজ্ঞার শিকার হয়। স্কুল-কলেজের সহপাঠী থেকে শুরু করে শিক্ষক, আত্মীয়স্বজন বা প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও তারা স্বাভাবিক আচরণ পায় না। এসব ক্ষেত্রে তারা কৌতূহল, সহানুভূতির পাশাপাশি কখনও কখনও বিদ্রূপের মুখোমুখিও হয়। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি শিশুদের মধ্যে একধরনের আত্মগোপনের প্রবণতা তৈরি করে। তারা নিজেদের পারিবারিক বাস্তবতা লুকাতে চায়, বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যায়। একটা সময় ধীরে ধীরে একাকিত্বে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এর ফলে তাদের সামাজিক দক্ষতা কমে যায় এবং মানসিক চাপ আরও বৃদ্ধি পায়।

ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা, রাগ এবং বিষণ্নতা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। তারা প্রায়ই দ্বিধায় থাকে, কাকে সমর্থন করবে, কোথায় নিজেদের স্থান নির্ধারণ করবে। অনেক সময় তারা বাবা-মায়ের দ্বন্দ্বের মাঝখানে ‘মধ্যস্থতাকারী’ হয়ে ওঠে, যা তাদের বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া, পারিবারিক অস্থিরতা তাদের শিক্ষাজীবনেও প্রভাব ফেলে। মনোযোগের ঘাটতি, ফলাফলের অবনতি এবং বিদ্যালয়বিমুখতা এর সাধারণ লক্ষণ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এই ধরনের ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানরা প্রচণ্ড মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন অবজ্ঞা-অবহেলার কারণে হীনমন্যতায় ভুগে শিক্ষাঙ্গন থেকে ঝরে পড়ে।

এই সমস্যার সমাধান এককভাবে সম্ভব নয়, প্রয়োজন পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ। প্রথমত, বাবা-মায়ের উচিত সন্তানের সামনে পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখা, এমনকি বিচ্ছেদের পরেও। শিশুকে কখনোই দ্বন্দ্বের অংশ বানানো উচিত নয়। এর পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অন্যান্য সামাজিক কাঠামোতে কাউন্সেলিং ব্যবস্থাকে জোরদার করা প্রয়োজন, যাতে ব্রোকেন ফ্যামিলির সন্তানরা তাদের অনুভূতি প্রকাশের সুযোগ পায়। তারা যেন আশপাশের মানুষের দ্বারা অবহেলার শিকার না হয়।

এক্ষেত্রে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি সবার আগে। কারণ কেউই বিয়ের পর তার সংসার ভেঙে বেরিয়ে যেতে চায় না। এক্ষেত্রে যদি তাদের সন্তান থাকে, তাহলে তো সেই সম্ভাবনা আরও হ্রাস পায়। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায়, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার সমাধান করতে গিয়েই স্বামী-স্ত্রীকে সংসার ভেঙে বেরিয়ে যেতে হয়। এই পুরো ঘটনায় ওই পরিবারের শিশুর কোনো দায় নেই। তাই শিশুকে তার পারিবারিক অবস্থার জন্য বিচার না করে, তার ব্যক্তিত্ব ও সম্ভাবনাকে মূল্যায়ন করা উচিত। তাকে আমাদের সমাজের অন্য আট-দশটা সন্তানের মতোই বেড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া উচিত।

ভাঙা পরিবারের সন্তানরা দুর্বল নয়, তারা শুধু ভিন্ন এক বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে বেড়ে ওঠে। সঠিক সহায়তা, ভালোবাসা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পেলে তারাও হতে পারে আত্মবিশ্বাসী ও সফল মানুষ। এমন উদাহরণও সমাজে আছে ভুরিভুরি। তাই প্রয়োজন শুধু তাদের প্রতি একটু খেয়াল রাখা, সহমর্মিতা এবং দায়িত্বশীল আচরণ প্রদর্শন করা।

This post was viewed: 14

আরো পড়ুন