দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় চলচ্চিত্র তারকা সি. জোসেফ বিজয়, যিনি থালাপতি বিজয় নামে পরিচিত, প্রথমবারের মতো সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নিয়ে তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের চমক তৈরি করেছেন। তাঁর নেতৃত্বাধীন নবগঠিত দল তামিলাগা ভেটরি কাজাগাম (টিভিকে) চলমান বিধানসভা নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে।
সোমবার দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে ভোট গণনা চলমান অবস্থায় সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী টিভিকে ১০১টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। একই সময়ে এআইএডিএমকে জোট ৭৮টি আসনে এবং ক্ষমতাসীন ডিএমকে ৫০টি আসনে এগিয়ে আছে। তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১১৮টি আসন।
প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়েই বিজয়ের দল এমন অবস্থানে পৌঁছানোকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘চমকপ্রদ অগ্রগতি’ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে প্রচলিত দুই প্রধান শক্তি, ডিএমকে এবং এআইএডিএমকের দীর্ঘদিনের আধিপত্যের মধ্যে তৃতীয় শক্তি হিসেবে টিভিকে-র উত্থান রাজ্যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করছে।
বিজয় এ নির্বাচনে দুটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পেরাম্বুর এবং তিরুচিরাপল্লি (পূর্ব)। প্রচারণার সময় তিনি নিজেকে ‘প্রত্যেক তামিল পরিবারের সদস্য’ হিসেবে উপস্থাপন করেন এবং রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল দ্রাবিড় মুন্নেত্র কাঝগম (ডিএমকে)-কে ক্ষমতা থেকে সরাতে ‘হুইসেল রেভলিউশন’-এর ডাক দেন।
তার এই রাজনৈতিক অবস্থান এবং এককভাবে নির্বাচনী লড়াইয়ের সিদ্ধান্তকে কেউ কেউ ১৯৯১ সালের জয়ললিতার কৌশলের সঙ্গে তুলনা করছেন, যখন তিনি একাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তবে ডিএমকের শীর্ষ নেতৃত্ব এই নতুন রাজনৈতিক উত্থানকে কটাক্ষ করেও দেখছে।
থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা এসেছে তার দীর্ঘ ও সফল চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারের পর। দক্ষিণ ভারতের সিনেমা জগতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা এই তারকা হঠাৎ করেই রাজনীতিতে প্রবেশ করায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা নির্বাচনী প্রচারণায় বড় ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে তার রাজনৈতিক যাত্রা একেবারে চ্যালেঞ্জহীন ছিল না। ২০২৫ সালের কারুর স্ট্যাম্পিড-সংক্রান্ত একটি ঘটনায় তদন্তের মুখোমুখি হন তিনি, যা তার রাজনৈতিক ইমেজে কিছুটা চাপ তৈরি করে। তবুও তিনি কোনো রাজনৈতিক জোটে না গিয়ে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন।
সম্পদ বিবেচনায়ও তিনি আলোচনায় রয়েছেন। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৬২৪ কোটি রুপি, যা তাকে এই নির্বাচনের অন্যতম ধনী প্রার্থী হিসেবে পরিচিত করেছে।
ব্যক্তিগত জীবনের কারণেও তিনি মাঝেমধ্যে সংবাদ শিরোনামে এসেছেন, বিশেষ করে তার পারিবারিক জীবন ও বিচ্ছেদ সংক্রান্ত গুঞ্জন নিয়ে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী দুই আসনেই শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছে। পেরাম্বুরে তিনি লড়ছেন ডিএমকের আর. ডি. সেকারের বিরুদ্ধে এবং তিরুচিরাপল্লি (পূর্ব) আসনে ডিএমকের ইনিগো ইরুদয়ারাজ ও এআইএডিএমকের কে. রাজাসেকরানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নির্বাচনে জয়ী হলে বিজয় বেশ কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে, স্নাতকদের জন্য মাসিক ৪ হাজার রুপি ভাতা, নারীদের জন্য ২ হাজার ৫০০ রুপি সহায়তা এবং বিয়ের উপহার হিসেবে সোনা ও শাড়ি প্রদান। পাশাপাশি সরকারি পরীক্ষাগুলো সময়মতো সম্পন্ন করার নিশ্চয়তাও দিয়েছেন তিনি।
২০২১ সালের নির্বাচনে এই দুই আসনেই ডিএমকে জোট জয়ী হয়েছিল। তবে এবার বিজয়ের অংশগ্রহণ তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে, যা রাজ্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।