অন্য আট-দশটা সামাজিক মাধ্যমের মতো ইমোতেও আছে রুম বা গ্রুপ ক্রিয়েট করার ব্যবস্থা। আর এই রুম ও গ্রুপগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠছে ডিজিটাল পতিতালয়। কীভাবে?
চলুন, সেই বিষয়টাই জানার চেষ্টা করি। ইমো-তে খোলা এই রুমগুলো বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এর মধ্যে আমাদের অনুসন্ধানে লাইভ শো, চ্যাটভিত্তিক, অডিও কলসহ রেকর্ডেড কন্টেন্ট শেয়ার করার মতো বিভিন্ন রুমের তথ্য উঠে এসেছে। তবে আপনি চাইলেই এসব রুমে অনায়াসে প্রবেশ করতে পারবেন না। মূলত রুমগুলো পাবলিক করা থাকলেও এগুলোতে প্রবেশের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে আপনার দরকার হবে একটি সিক্রেট পাসওয়ার্ড, যা কেবলমাত্র রুম ক্রিয়েটরের কাছেই থাকে।
পাসওয়ার্ড লাগবে, কারণ এই ধরনের রুমগুলোর ভেতরেই চলে নানা অসামাজিক কাজ। দেখা গেছে, ভিডিও কিংবা লাইভ শো ক্যাটাগরির রুমগুলো ক্রিয়েট করে উঠতি বয়সের মেয়েরা লাইভে এসে নিজের পোশাক পরিবর্তন, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি থেকে শুরু করে রগরগে কর্মকাণ্ডে মাতিয়ে রাখে গ্রুপে থাকা তরুণ-যুবক সবাইকে।
এভাবে একই ধরনের কর্মকাণ্ড চলে অডিও, চ্যাটভিত্তিক থেকে শুরু করে রেকর্ডেড কন্টেন্ট রুমগুলোতেও। মূলত অডিও-ভিডিও, রেকর্ডেড থেকে শুরু করে চ্যাটভিত্তিক সকল গ্রুপেরই আসল উপাদান যৌন উত্তেজক কর্মকাণ্ড। এই ধরনের রুমে প্রবেশ করতে হলে আপনাকে প্রথমে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ওই রুমের এডমিনের দেওয়া ব্যাংকিং মাধ্যমে পাঠাতে হবে।
টাকা দেওয়ার পর মিলবে সেই রুমে প্রবেশাধিকার। রুমে প্রবেশের পর একজন ব্যক্তি যত বেশি পরিমাণে টাকা পাঠাতে থাকবেন, গ্রুপে তার প্রভাব ততই বাড়বে। টাকা বেশি দিলে গ্রুপে থাকা মেয়ে তার কথা শোনা থেকে শুরু করে তার ইচ্ছামতো অঙ্গভঙ্গি ও বিভিন্ন কাজ করে। এতে করে রুমে এসে লাইভ দেখতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে একপ্রকার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়- কে কার থেকে বেশি টাকা পাঠাতে পারে!
এই একই চিত্র চ্যাটভিত্তিক গ্রুপ থেকে শুরু করে অডিও কলভিত্তিক গ্রুপগুলোতেও দেখা যায়। ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর বিভিন্ন পেজ ও চ্যানেলের কমেন্ট বক্সে গেলে প্রায়শই দেখা যায় এই সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন, যেখানে “এই গ্রুপে এতগুলো ফ্রি মাইন্ডের মেয়ে আছে, আমাদের গ্রুপের কনটেন্টই সেরা” এর মতো বিভিন্ন চটকদার কথা উল্লেখ থাকে।
তবে এই ধরনের প্রত্যেকটি বিজ্ঞাপনের নিচে শেষ লাইনে একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তা হলো একটি নগদ কিংবা বিকাশ নম্বর দিয়ে উল্লেখ করা থাকে, ‘গ্রুপে জয়েন করতে চাইলে নির্দিষ্ট পরিমাণে টাকা পাঠিয়ে নিম্নোক্ত নম্বর কিংবা পেইজে যোগাযোগ করুন’। কিন্তু এমন কাজেও প্রতারণার শেষ নেই। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিভিন্ন ভুয়া আইডি ব্যবহার করে ছেলেরাও এসব কার্যকলাপে যুক্ত থাকে। টাকা পাওয়া মাত্রই ব্লকের ঘটনাও ঘটে হরহামেশাই।
মূলত ইমো অ্যাপ ঘিরে এমন প্রতারণার বড় বাজার গড়ে ওঠার কারণ এর জনপ্রিয়তা। বিশ্বজুড়ে ইমোর প্রায় ২০ কোটির ব্যবহারকারী মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যাই সাড়ে ৪ কোটির অধিক। মানে দাঁড়ায়, ইমোর বিশ্বজুড়ে মোট ব্যবহারকারীর চার ভাগের প্রায় এক ভাগ বাংলাদেশি।
২০২৩ সালে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশিরা এই অ্যাপ ব্যবহার করে ওই বছর প্রায় ৩,৫৮০ কোটি আন্তর্জাতিক কল করেছেন। এছাড়াও ২৪৭.৯ বিলিয়ন (২৪,৭৯০ কোটি) বার বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগ (কল, মেসেজ ইত্যাদি) করেছেন। গড়ে প্রত্যেক ব্যবহারকারী বছরে প্রায় ৭৩০ বার অ্যাপ ব্যবহার করে যোগাযোগ করেছেন, অর্থাৎ দিনে প্রায় দুইবার।
শুধু মেসেজের ক্ষেত্রেই বাংলাদেশিরা ২০২৩ সালে প্রায় ১০১ বিলিয়ন (১০,১০০ কোটি) মেসেজ পাঠিয়েছেন। এছাড়া মোট কলের সংখ্যা ছিল প্রায় ৯,১৬০ কোটি, যার মধ্যে ৩,৫৮০ কোটি ছিল আন্তর্জাতিক কল। এছাড়াও, বাংলাদেশি ব্যবহারকারীরা ওই বছরে ৬৭৬ মিলিয়নের বেশি গ্রুপ কল করেছেন।
আন্তর্জাতিক কলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যোগাযোগ হয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, মালয়েশিয়া ও কাতারে। এই তালিকায় থাকা মধ্যপ্রাচ্যের চারটি দেশেই প্রবাসীদের বৃহৎ অংশের বাস। আর এসব দেশে প্রচলিত সামাজিক মাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপ ও ফেসবুকের মতো অ্যাপগুলো নিষিদ্ধ, যা অঞ্চলগুলোতে থাকা স্বল্পশিক্ষিত শ্রমজীবী প্রবাসীদের এই অ্যাপ ব্যবহারে বাধ্য করে।
এর পাশাপাশি ইমো অ্যাপ ব্যবহারের অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে এতে ডাটা চার্জ খুব কম হয় এবং স্বল্প নেটওয়ার্কেও এই অ্যাপ দিয়ে অনায়াসে কথা বলা যায়। আমাদের দেশ থেকে যারা প্রবাসে থাকেন, তাদের বেশিরভাগেরই বাড়ি প্রান্তিক অঞ্চলে। সাধারণভাবেই প্রান্তিক অঞ্চলে নেটওয়ার্ক খুব বেশি পাওয়া যায় না, যার ফলে ইমো ব্যবহার করে অনায়াসে কথা বলা যায়। এছাড়াও অন্যান্য অ্যাপের তুলনায় ইমোর ব্যবহার সহজ, এতে কয়েকটি ক্লিকেই একাউন্ট খোলা যায়। একাউন্ট খোলার পর ফোনের কন্টাক্টে থাকা নম্বরগুলো অনায়াসেই ইমোতে এসে পড়ে, যা এর ব্যবহারকে আরও সহজলভ্য করে তুলেছে। এসব বিষয় স্বল্পশিক্ষিত মানুষের মধ্যে অ্যাপটির ব্যবহারকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
আর এসবের সুযোগ নিয়েই যৌনতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতারণামূলক ফাঁদ পেতেছে কিছু অসাধু চক্র। যারা মিথ্যে, প্রতারণা, ভয়, প্রেমসহ বিভিন্নভাবে ফাঁদে ফেলে অসচেতন মানুষের থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকা। এমনই এক প্রতারক চক্রের ১২ সদস্যকে গত বছরের ৯ জুলাই নাটোর থেকে আটক করে সেনাবাহিনী। চক্রটি ইমো অ্যাপ ব্যবহার করে দেশি ও প্রবাসীদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায় করত।
এই ধরনের ঘটনার আরেকটি নজির দেখা যায় মেহেরপুরে, ২০২৪ সালে। ওই ঘটনায় সৌদি প্রবাসী নাজমুলের স্ত্রী মাহাবুবার কাছ থেকে তার স্বামী পুলিশের কাছে আটক হয়েছে দাবি করে ৩ লাখের বেশি টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্র। টাকা দেওয়ার পর মাহাবুবা জানতে পারেন, তার স্বামীর ইমো একাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে। এই ঘটনা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর থেকে জানা যায়, সেই সময়ে ৬ মাসে শুধু মেহেরপুরেই ইমোতে প্রতারণার মাধ্যমে অন্তত ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় প্রতারক চক্র, যা এই অ্যাপ ঘিরে প্রতারণার বিশালতার চিত্রকে তুলে ধরে।
এভাবেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোবাইল ফোনের তথ্য চুরি, প্রতারণা ও প্রবাসীদের ইমো হ্যাক করে পরিবারের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বিপুল পরিমাণ টাকা।
এই ধরনের প্রতারণা থেকে বাঁচতে আইটি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ চাওয়া হলে তারা জানান, অ্যাপটি চালু করলে প্রথমেই সেটিংস থেকে এড আসার সিস্টেমটি বন্ধ করতে হবে। এতে এড আসা বন্ধ হলে ঝুঁকি কমে যায় অনেকটাই।
একটি ইমো একাউন্ট হ্যাক করতে সব সময় ভেরিফিকেশন কোড প্রয়োজন হয়। তাই যদি কেউ কখনো ফোন করে বা কোনো মাধ্যমে জানায় আপনি লটারি জিতেছেন কিংবা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে ফোন করা হয়েছে, তখন কোনোভাবেই কারও সঙ্গে কোড শেয়ার করা যাবে না। এছাড়াও যদি কখনো কেউ ফোন করে টাকা চায় কিংবা কোনো বিপদের কথা বলে, তখন হুট করেই দিশেহারা না হয়ে আগে বিষয়টি যাচাই করতে হবে- ঘটনাটি আসলেই সত্য কিনা। তাহলেই বাঁচা যাবে ইমোভিত্তিক বিভিন্ন প্রতারণা থেকে।