ঢাকার পথঘাট, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে রিকশা। আজকের ব্যস্ত মহানগরে এটি যেমন সাধারণ মানুষের সহজলভ্য পরিবহন, তেমনি শহরের ঐতিহ্যেরও এক অনন্য প্রতীক। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাকে ‘রিকশার শহর’ বলা হয়। শহুরে জীবনের সড়কজুড়ে এর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তবে এই পরিচিত বাহনটির উৎপত্তি ও ঢাকায় আগমনের ইতিহাস বেশ আকর্ষণীয়।
রিকশা শব্দটি জাপানি ‘জিনরিকিশা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ মানুষের শক্তিচালিত যান। উনিশ শতকের শেষভাগে জাপানে এর উৎপত্তি। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৮৬৯ সালের দিকে জাপানের টোকিওতে ইজুমি ইয়োসুকে, তাকায়ামা কসুজো এবং সুজুকি তোড়াজো নামের তিন ব্যক্তি প্রথম রিকশার নকশা তৈরি করেন।
প্রাথমিকভাবে এটি ছিল দুই চাকার হালকা যান, যা একজন মানুষ টেনে নিয়ে যেত। পরবর্তীতে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
রিকশার ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। এটি শুধু বাংলাদেশেই নয়, চীন, জাপান, ভারত, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও প্রচলিত। দেশভেদে এর গঠন ও নাম ভিন্ন। চীনে সানলুঞ্চে, কম্বোডিয়ায় সিক্লো, মালয়েশিয়ায় বেকা এবং ইউরোপে পেডিক্যাব নামে পরিচিত। প্রাচীন জাপানে প্রথমে হাতেটানা রিকশার ব্যবহার দেখা যায়।
রিকশার আবিষ্কার নিয়ে কিছু লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। যেমন- একজন ব্যক্তি তার অসুস্থ স্ত্রীকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য এই বাহন তৈরি করেছিলেন। যদিও এ গল্পটি ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত নয়, তবুও এটি রিকশার মানবিক ও প্রয়োজনভিত্তিক উদ্ভাবনের ধারণাকে তুলে ধরে।
জাপান থেকে রিকশা প্রথমে চীন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে আসে। উনিশ শতকের শেষদিকে কলকাতায় রিকশার প্রচলন শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে এটি বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) এবং অন্যান্য অঞ্চলেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে রিকশার আগমন নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। অধিকাংশ গবেষকের মতে, ১৯৩০-এর দশকের শেষদিকে ঢাকায় প্রথম রিকশা আসে। কেউ কেউ বলেন, ১৯৩৬ বা ১৯৩৭ সালে, আবার অনেকে ১৯৩৮ সালকে নির্ভরযোগ্য সময় হিসেবে উল্লেখ করেন।
ধারণা করা হয়, কলকাতা থেকে কিছু ইউরোপীয় পাট ব্যবসায়ী বা ধনী ব্যক্তি নিজেদের ব্যবহারের জন্য ঢাকায় রিকশা নিয়ে আসেন। একই সময়ে নারায়ণগঞ্জ ও ময়মনসিংহ অঞ্চলেও রিকশার ব্যবহার শুরু হয়।
চট্টগ্রামে ১৯১৯ বা ১৯২০ সালের দিকে মিয়ানমার হয়েই রিকশার আগমন ঘটে। কোনো কোনো সূত্রমতে, ঢাকায় প্রথম রিকশার লাইসেন্স দেওয়া হয় ১৯৪৪ সালের দিকে।
আরেকটি প্রচলিত তথ্যে জানা যায়, মৌলভীবাজার এলাকার দুজন ব্যবসায়ী চন্দননগর থেকে দুটি সাইকেল রিকশা এনে ঢাকায় চালু করেন। প্রতিটি রিকশার দাম ছিল প্রায় ১৮০ টাকা। শুরুতে মানুষ এই বাহনে চড়তে সংকোচ বোধ করত। অন্যের টানে চলা নিয়ে সামাজিক অস্বস্তি ছিল প্রবল। এমনকি কেউ রিকশায় উঠলে পথচারীরা তা কৌতূহল নিয়ে দেখত।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংকোচ কাটে এবং রিকশার চাহিদা বাড়তে থাকে। ফলে স্থানীয় কারিগররা নিজেরাই রিকশা তৈরি শুরু করেন। যারা আগে সাইকেল মেরামতের কাজ করতেন, তারাই এই নতুন শিল্পে যুক্ত হন। বিশেষ করে স্থানীয় মুসলিম ও বসাক সম্প্রদায়ের কারিগররা দ্রুত এই প্রযুক্তি আয়ত্ত করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিদেশ থেকে রিকশা আমদানি বন্ধ হয়ে গেলে দেশীয় উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পায়। তখন রিকশার গায়ে রঙিন নকশা ও চিত্রকর্মের প্রচলন শুরু হয়, যা পরবর্তীতে ‘রিকশা আর্ট’ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করে।
সংখ্যার দিক থেকে ঢাকায় রিকশার বিস্তার ছিল চোখে পড়ার মতো। ১৯৪১ সালে ঢাকায় রিকশার সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৭টি। ১৯৪৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮১-তে। স্বাধীনতার পর নগরায়ণ ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রিকশার সংখ্যাও দ্রুত বাড়ে। বর্তমানে ঢাকার রাস্তায় রিকশার সংখ্যা ১২ লক্ষাধিক বলে জানা যায় ‘এখন টিভি’র এক প্রতিবেদন থেকে, যার মাঝে লাইসেন্সধারী ছিল মাত্র ২ লাখ ১৪ হাজারের কাছাকাছি। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্যমতে (২০১৪), ঢাকায় কমপক্ষে ৫ লাখ রিকশা রয়েছে, যা বিশ্বে সর্বাধিক।
বর্তমানে ঢাকার প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ দৈনন্দিন যাতায়াতে রিকশার ওপর নির্ভরশীল। এটি যেমন স্বল্প দূরত্বে আরামদায়ক, তেমনি যানজটপূর্ণ সড়কে সহজে চলাচলের জন্যও কার্যকর।
সব মিলিয়ে, রিকশা শুধু একটি পরিবহন নয়; এটি ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক যানবাহনের বিস্তার ঘটলেও, রিকশা এখনও এই শহরের প্রাণস্পন্দন হিসেবে টিকে আছে।