Ridge Bangla

বাঙালির মিষ্টিবিলাস: ঐতিহ্যের অপূর্ব আখ্যান

বারো মাসে তেরো পার্বণ- উৎসবপ্রিয় বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বোঝাতে এই প্রবাদের চেয়ে ভালো কিছু আর হয় না। প্রতিটি অঞ্চলের উৎসবে কিছু অপরিহার্য উপাদান থাকে। বাঙালির উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মিষ্টি। উৎসব বা খাবার, শেষ পাতে একটু মিষ্টি না হলে যেন বাঙালির চলেই না। কেবল স্বাদ নয়, মিষ্টির সঙ্গে জড়িয়ে আছে আঞ্চলিক পরিচয় এবং শত বছরের ইতিহাস।

বাংলাদেশের প্রতিটি জনপদ কোনো না কোনো বিশেষ মিষ্টির জন্য বিখ্যাত। ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া থেকে শুরু করে মুখে মুখে ফেরা কিংবদন্তি- সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মিষ্টির সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ,  যা আমাদের যুগ যুগ ধরে মিষ্টান্নপ্রেমের চিত্রই ফুটিয়ে তোলে।

নানা প্রকার মিষ্টি সম্পর্কে চলুন কিছু চমকপ্রদ তথ্য জেনে নেওয়া যাক।

১. নাটোরের কাঁচাগোল্লা

নাটোরের ঐতিহ্যের ধারক এই মিষ্টি মূলত কোনো গোল্লা নয়। এটি খাঁটি দুধের ছানা ও চিনির সংমিশ্রণে তৈরি এক বিশেষ মিষ্টান্ন। কথিত আছে, মহারানি ভবানীর আমলে একদিন ছানা নষ্ট হওয়া থেকে বাঁচাতে মিষ্টি ব্যবসায়ী মধুসূদন পাল ছানায় চিনির সিরা দিয়ে এটি উদ্ভাবন করেছিলেন। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর কাঁচা ছানার তীব্র ঘ্রাণ ও পরিমিত মিষ্টি।

২. কুমিল্লার রসমালাই

কুমিল্লার মনোহরপুরের ‘মাতৃভাণ্ডার’ এই মিষ্টির আদি উৎস। শুরুতে এর নাম ছিল ‘ক্ষীরভোগ’। পরবর্তীতে পাকিস্তানি আমলে এটি ‘রসমালাই’ নামে পরিচিতি পায়। ঘন দুধের ক্ষীরের মধ্যে ডুবানো ছোট ছোট ছানার বলগুলো এই মিষ্টিকে অনন্যতা দান করেছে।

৩. টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম

‘মিষ্টির রাজা’ হিসেবে খ্যাত পোড়াবাড়ির চমচম প্রায় দেড়শ বছরের পুরনো। এর লালচে রঙের উপরিভাগ এবং ভেতরের রসালো, নরম গঠন একে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করেছে। ধলেশ্বরী নদীর পানির বিশেষত্বের কারণে এই মিষ্টির স্বাদ অনন্য হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

৪. মুক্তাগাছার মণ্ডা

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মণ্ডা এক কিংবদন্তি। ১৮২৪ সালে গোপাল পাল নামের এক কারিগর এটি তৈরি শুরু করেন। সাদা কাগজে মোড়ানো চ্যাপ্টা আকৃতির এই মিষ্টি অত্যন্ত সুস্বাদু এবং দীর্ঘস্থায়ী। এটি তৈরিতে কেবল দুধ ও চিনি ব্যবহৃত হয়।

৫. নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি

আকৃতিতে বালিশের মতো এবং উপরে ক্ষীরের প্রলেপ দেওয়া এই মিষ্টি নেত্রকোনার গয়ানাথ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের আবিষ্কার। বড় আকারের একটি বালিশ মিষ্টি প্রায় ১৩-১৪ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, যা ভোজনরসিকদের বিশেষ আকর্ষণ।

৬. নওগাঁর প্যারা সন্দেশ

হালকা খয়েরি রঙের এই সন্দেশ মূলত দেব-দেবীর উপাসনায় প্রসাদ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এতে দুধ আর চিনি ছাড়া অন্য কোনো উপকরণ ব্যবহার করা হয় না। সাত লিটার দুধ জ্বাল দিয়ে মাত্র এক কেজি প্যারা সন্দেশ তৈরি করা হয়, যা এর ঘনত্বের প্রমাণ দেয়।

৭. ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছানামুখী

ছোট ছোট চারকোনা আকৃতির এই মিষ্টি অত্যন্ত শক্ত এবং চিনির কোটিং দেওয়া। এটি সম্প্রতি বাংলাদেশের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এর কচকচে ভাব এবং দুধের বিশুদ্ধ স্বাদ একে অনন্য করে তুলেছে।

৮. মেহেরপুরের সাবিত্রী ও রসকদম্ব

এই মিষ্টি দুটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো ফ্রিজে না রাখলেও দীর্ঘ সময় ভালো থাকে। মেহেরপুরের ১৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই মিষ্টিগুলো মূলত দুধের চাছি ও চিনির নিপুণ কারুকাজ।

৯. গাইবান্ধার রসমঞ্জরী

ক্ষীরের ঘন রসে ছোট ছোট গোল মিষ্টির মিশ্রণ হলো রসমঞ্জরী। ১৯৪০-এর দশকে গাইবান্ধায় এটি প্রথম তৈরি শুরু হয়। এর স্বাদ ও গুণাগুণ উত্তরবঙ্গে একে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে।

১০. রাজশাহীর রসকদম

রাজশাহীর প্রাচীনতম মিষ্টান্নগুলোর মধ্যে রসকদম অন্যতম। উপরে চিনির ছোট ছোট দানাদার আবরণ এবং ভেতরে নরম ছানার মিশ্রণ এই মিষ্টিকে একটি বিশেষ টেক্সচার দেয়। দেশ ও দেশের বাইরে খ্যাতি রয়েছে রাজশাহীর বিখ্যাত রসকদমের।

এ ছাড়া দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে বিশেষ বিশেষ সব মিষ্টি, যা নিয়ে ওই অঞ্চলের মানুষ গর্ব করেন। ময়রার হাতের জাদুতে স্বাদে টইটুম্বুর হওয়া মিষ্টির এই তালিকায় আরও নাম থাকবে যশোরের জামতলার ঝোল মিষ্টি, বিক্রমপুর ও কলাপাড়ার রসগোল্লা, শাহজাদপুরের রাঘবসাই, খুলনা, মুন্সীগঞ্জ ও বরিশালের আমৃতি, যশোরের খেজুরের গুড়ের প্যারা সন্দেশ, মাদারীপুরের রসগোল্লা, সিরাজদিখানের পাতক্ষীরা, নওগাঁর রসমালাই, সিরাজগঞ্জের পান্তুয়া, চাপাইনবাবগঞ্জের চমচম ইত্যাদির।

বাংলাদেশের এই মিষ্টিগুলো কেবল খাবারের তালিকায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং এগুলো একেকটি অঞ্চলের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অংশ। বর্তমান সময়ে বাণিজ্যিকীকরণের চাপে অনেক ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি তার আদি স্বাদ হারালেও, কারিগরদের নিষ্ঠা এবং ভোক্তাদের ভালোবাসায় এই রসনাবিলাস আজও টিকে আছে স্বমহিমায়।

This post was viewed: 11

আরো পড়ুন