১৯৪৫ সালের মে মাস। বার্লিনের একটি ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে অ্যাডলফ হিটলারের আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে ইউরোপে অবসান ঘটেছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী অধ্যায়- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। মিত্রশক্তির বিজয়ে পৃথিবী ফিরে পেয়েছিল গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার স্বাদ। কিন্তু ইতিহাসের চাকা যদি সামান্য ভিন্নভাবে ঘুরত? যদি স্ট্যালিনগ্রাদের যুদ্ধে নাৎসি বাহিনী জয়ী হতো, কিংবা নরম্যান্ডি অবতরণ ব্যর্থ হতো? উত্তরটা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। হিটলার যদি জিতে যেতেন, তবে আজকের পরিচিত পৃথিবীটা হয়তো এক অন্ধকার ‘ডিস্টোপিয়ান’ সাম্রাজ্যে পরিণত হতো।
ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠন
হিটলারের জয়ের পর পৃথিবীর মানচিত্র সম্পূর্ণ বদলে যেত। নাৎসি জার্মানির মূল লক্ষ্য ছিল ‘লেবেন্সরম’ (Lebensraum) বা জার্মান জাতির জন্য পর্যাপ্ত বসবাসের জায়গা তৈরি করা। এই পরিকল্পনায় ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ জার্মানির সরাসরি শাসনাধীন অথবা তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হতো। সোভিয়েত ইউনিয়নকে কয়েক টুকরো করে উরাল পর্বতমালা পর্যন্ত অঞ্চলগুলো নাৎসি উপনিবেশে পরিণত করা হতো। অন্যদিকে, এশিয়ায় জাপানের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতো। জার্মানি এবং জাপান হয়তো পৃথিবীকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিত। উত্তর আমেরিকা বা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি দখলদারি না থাকলেও, সেখানে হয়তো একটি নাৎসি-ঘেঁষা পুতুল সরকার বসানো হতো। আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত কেবলই উড়ত স্বস্তিকা আর উদীয়মান সূর্যের পতাকা।
জেনারেলপ্ল্যান ওস্ট: জাতিগত নিধনের চরম রূপ
হিটলারের বিজয়ের সবচেয়ে বিভীষিকাময় দিক হতো তার ‘জাতিগত বিশুদ্ধতা’র পাগলামি। নাৎসিদের ‘জেনারেলপ্ল্যান ওস্ট’ অনুযায়ী, পূর্ব ইউরোপের স্লাভ জাতিভুক্ত কোটি কোটি মানুষকে হয় হত্যা করা হতো, নয়তো সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করা হতো। বাকিদের রাখা হতো কেবল জার্মান ‘মাস্টার রেস’ বা আর্যদের দাস হিসেবে কাজ করার জন্য। ইহুদি নিধন বা হলোকাস্ট তার চূড়ান্ত রূপ পেত। হিটলারের জয়ের অর্থ দাঁড়াতো ইউরোপ থেকে ইহুদিদের সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। কেবল জাতিগত পরিচয় নয়, শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম ব্যক্তি, রাজনৈতিক বিরোধী এবং নাৎসি আদর্শের বাইরের সবাইকে সমাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া হতো। এককথায়, পৃথিবী হতো এক বিশাল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।
স্থাপত্য ও সংস্কৃতি: ‘জার্মানিয়া’র উত্থান
হিটলারের ব্যক্তিগত স্থপতি আলবার্ট স্পার বার্লিনকে বিশ্বের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘জার্মানিয়া’। সেখানে তৈরি হতো বিশালকার সব অডিটোরিয়াম এবং গম্বুজ, যার নিচে হাজার হাজার মানুষ হিটলারের প্রোপাগান্ডা শোনার জন্য সমবেত হতো। আজকের প্যারিস বা লন্ডনের মতো শহরগুলো তাদের নিজস্ব জৌলুস হারিয়ে নাৎসি স্থাপত্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে যেত।
সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা বলতে কিছু থাকত না। নাৎসিদের দ্বারা নিষিদ্ধ বইগুলো পুড়িয়ে ফেলা হতো। শিল্পকলা, সংগীত এবং চলচ্চিত্র কেবল রাষ্ট্রের গুণগানে ব্যবহৃত হতো। সংবাদপত্রের কোনো স্বাধীনতা থাকত না; প্রতিটি তথ্য আসত জোসেফ গোয়েবলসের প্রোপাগান্ডা মন্ত্রণালয় থেকে। মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতাকেও নিয়ন্ত্রণ করত রাষ্ট্র।
প্রযুক্তি ও অর্থনীতি
নাৎসি জার্মানি যুদ্ধের সময় প্রযুক্তিতে বেশ এগিয়ে ছিল। তারা যদি জয়ী হতো, তবে জেট ইঞ্জিন, রকেট প্রযুক্তি (ভি-২ রকেট) এবং পারমাণবিক শক্তির বিকাশ হয়তো তাদের হাতেই হতো। আজকের ইন্টারনেট বা মহাকাশ গবেষণার ইতিহাস হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। নাৎসিদের অধীনে অর্থনীতি চলত দাসশ্রমের ওপর ভিত্তি করে। বিজিত দেশগুলোর প্রাকৃতিক সম্পদ আর জনশক্তিকে কেবল জার্মানির সমৃদ্ধির জন্য নিংড়ে নেওয়া হতো। এতে হয়তো জার্মানি অত্যন্ত সম্পদশালী হতো, কিন্তু বাকি বিশ্ব ডুবে থাকত চরম দারিদ্র্য আর শোষণে।
প্রতিরোধের আগুন ও পতন
ইতিহাস বলে, চরম স্বৈরতন্ত্র কোনোদিন চিরস্থায়ী হয় না। হিটলারের মৃত্যুর পর (হয়তো বার্ধক্যজনিত কারণে) তার উত্তরসূরিদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হতো। বিশাল এই সাম্রাজ্য ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ত। বিভিন্ন দেশে গোপনে প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে উঠত। হয়তো কয়েক দশক পর নাৎসি সাম্রাজ্য ভেতর থেকেই ভেঙে পড়ত, ঠিক যেভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছিল। কিন্তু ততদিনে পৃথিবী হারাত কয়েক কোটি প্রাণ এবং মানব সভ্যতার হাজার বছরের সঞ্চিত জ্ঞান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের পরাজয় কেবল একটি সামরিক বিজয় ছিল না, এটি ছিল মানবিকতা আর স্বাধীনতার জয়। হিটলার জিতে গেলে আজ হয়তো আমরা মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে পারতাম না, আমাদের পরিচয় হতো কেবল ‘উচ্চ’ বা ‘নিম্ন’ জাতের দাসে। ফিলিপ কে ডিকের ‘দ্য ম্যান ইন দ্য হাই ক্যাসেল’ বা রবার্ট হ্যারিসের ‘ফাদারল্যান্ড’ উপন্যাসে এই অন্ধকারের চিত্র ফুটে উঠেছে। আজকের গণতান্ত্রিক পৃথিবীর ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও, হিটলারের কাল্পনিক নাৎসি সাম্রাজ্যের তুলনায় এটি পরম স্বর্গ। ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতার মূল্য অনেক সময় রক্ত দিয়ে চুকাতে হয়, আর সেই রক্ত বৃথা যায়নি বলেই আজ আমরা এই প্রশ্নটি নিয়ে নির্দ্বিধায় আলোচনা করতে পারছি।