Ridge Bangla

নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে: বাংলাদেশের গণভোটের ইতিহাস

​বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও আলোচনায় ‘গণভোট’ বা ‘রেফারেন্ডাম’। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, এবার সাধারণ নির্বাচন এবং গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণের সর্বোচ্চ মাধ্যম হলো গণভোট। রাষ্ট্রীয় কোনো অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বা সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনের প্রশ্নে যখন জনগণের সরাসরি মতামত নেওয়া হয়, তখনই তা গণভোট হিসেবে গণ্য হয়। বাংলাদেশের ৫৩ বছরের ইতিহাসে গণভোটের অভিজ্ঞতা মিশ্র- কখনও তা ব্যবহৃত হয়েছে একনায়কতন্ত্রের বৈধতা পেতে, আবার কখনও তা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

​গণভোটের সাংবিধানিক ভিত্তি

​বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের বিধানটি মূলত যুক্ত হয়েছিল সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে এর পরিবর্তন ঘটেছে। সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে গণভোটের বিধান রাখা হয়েছিল, যেখানে সংবিধানের প্রস্তাবনা বা মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি ভোট বাধ্যতামূলক ছিল। তবে ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই গণভোটের বিধানটি বিলুপ্ত করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে আদালত পঞ্চদশ সংশোধনী মামলার গণভোট বাতিলসংক্রান্ত অংশটিকে ‘বেআইনি’ ঘোষণা করলে সেটি আবার সংবিধানে পুনর্বহাল হয়েছে।

​ইতিহাসের প্রথম গণভোট: ১৯৭৭ সাল

​বাংলাদেশের প্রথম গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। তৎকালীন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান তার ক্ষমতা গ্রহণ এবং তার প্রবর্তিত ১৯-দফা কর্মসূচির প্রতি জনগণের আস্থা যাচাইয়ের জন্য এই ভোটের আয়োজন করেন। এটি ছিল একটি ‘হ্যাঁ-না’ ভোট। ব্যালট পেপারে প্রশ্ন ছিল, “প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান কর্তৃক গৃহীত নীতি ও কর্মসূচির প্রতি আপনার কি আস্থা আছে?” ​

সরকারি ফলাফল অনুযায়ী, ৯৮.৯ শতাংশ মানুষ জিয়াউর রহমানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল। তবে এই ভোটের স্বচ্ছতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক আজও বিদ্যমান। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন, এই গণভোটের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান তার ক্ষমতার একটি শক্তিশালী নৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

জেনারেল ​এরশাদের গণভোট: ১৯৮৫ সাল

​জেনারেল জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে দ্বিতীয় সামরিক শাসক জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও তার ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে গণভোটের আশ্রয় নেন। ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এরশাদের নীতি ও কর্মসূচির প্রতি জনসমর্থন যাচাই ছিল এই ভোটের উদ্দেশ্য। ফলাফল ছিল অনেকটা ১৯৭৭ সালের মতোই- প্রায় ৯৪.১৪ শতাংশ ভোটার ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোট প্রদান করেন।

​তবে এই গণভোটের সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল উত্তাল। প্রধান বিরোধী দলগুলো এই ভোট বর্জন করেছিল। ভোটার উপস্থিতির হার নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এই ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। এটি ছিল মূলত সামরিক শাসকের ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার একটি কৌশল।

​১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক গণভোট: গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন

​বাংলাদেশের গণভোটের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ইতিবাচক অধ্যায় হলো ১৯৯১ সালের গণভোট। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি জোরালো হয়। তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাস করা হয়, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ​সংবিধান অনুযায়ী এই পরিবর্তনের জন্য জনগণের সরাসরি রায় প্রয়োজন ছিল। ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সারা দেশে এই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময় প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) একমত হয়ে সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে প্রচারণা চালায়। ফলাফল ছিল অভাবনীয়- ভোট প্রদানকারী মানুষের প্রায় ৮৪ শতাংশই সংসদীয় পদ্ধতির পক্ষে রায় দেন। এই গণভোটটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এর মাধ্যমেই বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় পর প্রকৃত গণতান্ত্রিক কাঠামো ফিরে আসে।

​একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

​বর্তমানে যখন একই দিনে নির্বাচন এবং গণভোটের কথা ভাবা হচ্ছে, তখন এটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। একই সাথে দুটি ভিন্ন ব্যালট পেপারে ভোট দেওয়া সাধারণ ভোটারদের জন্য কিছুটা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। নির্বাচন কমিশনকে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। আলাদাভাবে দুটি ভোট না করে একদিনে করা হলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে- এটি এই উদ্যোগের ইতিবাচক দিক। গণভোটের বিষয়টি যদি কোনো সংবেদনশীল ইস্যু (যেমন: সংবিধানের মৌলিক সংস্কার বা রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তন) হয়, তবে সেখানে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ও ঐকমত্য থাকা জরুরি।

​গণভোট কেবল একটি সংখ্যাতাত্ত্বিক বিজয় নয়, এটি জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিফলন। বাংলাদেশের ইতিহাসে ইতিপূর্বে গণভোট যেমন একনায়কতন্ত্রের ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, তেমনি ১৯৯১ সালে তা গণতন্ত্রের সূর্যোদয়ও ঘটিয়েছে। আসন্ন নির্বাচনে যদি একই দিনে গণভোট আয়োজিত হয়, তবে তা হবে বাংলাদেশের ইতিহাসে চতুর্থ গণভোট। এর স্বচ্ছতা এবং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই নির্ধারণ করবে এই নতুন কৌশলটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে কতটা সুসংহত করতে পারে। ইতিহাসের শিক্ষা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অর্থবহ গণভোটই হতে পারে আগামীর স্থিতিশীল বাংলাদেশের চাবিকাঠি।

This post was viewed: 12

আরো পড়ুন