Ridge Bangla

এপস্টেইন ফাইলস: মার্কিন অভিজাতদের মুখোশ উন্মোচন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প বিতর্ক

​দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন আদালতের গোপন সিন্দুকে বন্দি থাকার পর অবশেষে উন্মোচিত হয়েছে কুখ্যাত ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনের অন্ধকার জগতের কয়েক হাজার পৃষ্ঠার নথি। গত কয়েকদিনে ধাপে ধাপে প্রকাশিত এই দলিলগুলো কেবল একটি অপরাধের বিবরণ নয়, বরং এটি মার্কিন ও বৈশ্বিক অভিজাতশ্রেণীর নৈতিক অবক্ষয় এবং ক্ষমতার আড়ালে চলা এক জঘন্য অধ্যায়ের প্রামাণ্য দলিল। এই নথিগুলোতে কেবল ভুক্তভোগীদের আর্তনাদই নেই, বরং জড়িয়ে আছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম, যা নতুন করে এক রাজনৈতিক ও সামাজিক ঝড়ের জন্ম দিয়েছে।

​রহস্যের উন্মোচন: আদালতের নতুন নথি

​২০২৪ সালের শুরু থেকেই আদালতের নির্দেশে এপস্টেইন সংশ্লিষ্ট নথিপত্র জনসমক্ষে আসা শুরু হয়। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত নতুন সেটটি বিশেষভাবে চাঞ্চল্যকর। ভার্জিনিয়া জিফ্রে এবং গিজলেন ম্যাক্সওয়েলের মধ্যকার মামলার জের ধরে এই নথিপত্রগুলো প্রকাশ্যে আসে। এতে প্রায় ১৭০ জনের বেশি ব্যক্তির নাম পাওয়া গেছে, যারা কোনো না কোনোভাবে এপস্টেইনের সাথে যোগাযোগ রেখেছিলেন। দলিলে বর্ণিত ঘটনার বিবরণ থেকে বোঝা যায়, এপস্টেইন কেবল একজন অপরাধী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একটি বিশাল নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে অর্থ আর প্রভাবের বিনিময়ে চলত মানুষ পাচার ও যৌন নিপীড়ন।

​ডোনাল্ড ট্রাম্প ও এপস্টেইন কানেকশন

​প্রকাশিত নথিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম বারবার আসায় মার্কিন রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও ট্রাম্প সবসময়ই দাবি করে এসেছেন যে, ২০০৪ সালের পর থেকে এ্যাপস্টেইনের সাথে তার কোনো সুসম্পর্ক ছিল না, কিন্তু আদালতের নথি অন্য কথা বলছে। নথিতে থাকা জবানবন্দি অনুযায়ী, ট্রাম্প এপস্টেইনের ব্যক্তিগত বিমানে যাতায়াত করেছেন এবং তার পাম বিচের ম্যানশনেও তাকে দেখা যেত।

​সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি হলো একজন ভুক্তভোগী ‘জেন ডো’-এর বয়ান। সেখানে দাবি করা হয়েছে যে, ট্রাম্পকে এপস্টেইনের ক্যাসিনো এবং ডিনারে দেখা যেত। যদিও ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো শারীরিক নিপীড়নের প্রমাণ এখনও এই ফাইলে মেলেনি, কিন্তু একজন কুখ্যাত যৌন অপরাধীর সাথে তার দীর্ঘকালীন ঘনিষ্ঠতা তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

​দলিলে বর্ণিত ভয়াবহ সব কুকর্ম

​নথিপত্রগুলোতে ভুক্তভোগীদের যে জবানবন্দি পাওয়া যায়, তা অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং শিউরে ওঠার মতো। সেখানে বর্ণিত হয়েছে কীভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাচার করা হতো। এপস্টেইনের ব্যক্তিগত দ্বীপ ‘লিটল সেন্ট জেমস’ ছিল এই অপরাধের মূল স্বর্গরাজ্য। ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, তাদের বাধ্য করা হতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অজান্তেই তাদের কর্মকাণ্ড রেকর্ড করে রাখা হতো, যাতে পরবর্তীতে তাদের ব্ল্যাকমেইল করা যায়। এপস্টেইন মূলত এই পদ্ধতি ব্যবহার করেই মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের নিজের হাতের পুতুলে পরিণত করেছিলেন।

​বিল ক্লিনটন ও প্রিন্স অ্যান্ড্রু: পশ্চিমা ক্ষমতার অন্যতম দুই স্তম্ভ

​কেবল ট্রাম্প নন, ডেমোক্র্যাট শিবিরের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নামও নথিতে অসংখ্যবার এসেছে। ক্লিনটন এপস্টেইনের বিমানে অনেকবার ভ্রমণ করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। যদিও ক্লিনটন দাবি করেছেন তিনি এপস্টেইনের অপরাধ সম্পর্কে কিছুই জানতেন না, কিন্তু নথিতে থাকা তথ্য বলছে তাদের সম্পর্ক ছিল অনেক গভীর। অন্যদিকে, ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে সরাসরি যৌন নিপীড়নের অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত হয়েছে এই ফাইলে। ভুক্তভোগী জোহানা সজোবার্গের জবানবন্দিতে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর কর্মকাণ্ডের যে বর্ণনা পাওয়া গেছে, তা রাজপরিবারের মর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

​বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও বর্তমান বাস্তবতা

​এপস্টেইন ফাইলস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, উচ্চবিত্ত সমাজে অপরাধের সংজ্ঞা অনেক সময় প্রভাব আর প্রতিপত্তি দিয়ে বদলে যায়। জেফরি এপস্টেইন ২০১৯ সালে জেলখানায় রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করলেও, তার এই বিশাল সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত রাঘববোয়ালরা এখনও মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দলিলে নাম আসা ব্যক্তিরা প্রভাবশালী হওয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত স্থবির হয়ে পড়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে বিচারের যে দাবি উঠেছে, তা উপেক্ষা করা মার্কিন বিচার বিভাগের জন্য কঠিন হবে।

​জেফরি এপস্টেইনের এই ফাইলগুলো কেবল কাগজের স্তূপ নয়, এগুলো ক্ষমতার নগ্ন রূপের বহিঃপ্রকাশ। ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন বা প্রিন্স অ্যান্ড্রুর মতো ব্যক্তিরা যখন একটি অন্ধকার জগতের অংশ হিসেবে পরিচিতি পান, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি চরম অনাস্থা তৈরি হয়। প্রকাশিত হওয়া তথ্যাবলি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ক্ষমতার অন্দরমহলে এমন অনেক রহস্য রয়েছে যা উন্মোচিত হওয়া জরুরি। ইতিহাসের এই কলঙ্কিত অধ্যায় থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি বিচার বিভাগ কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই ধরনের ‘এপস্টেইন সাম্রাজ্য’ ভবিষ্যতে আবারও গড়ে উঠতে পারে। ন্যায়বিচার কেবল ভুক্তভোগীদের অধিকার নয়, এটি সভ্য সমাজের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামও বটে।

This post was viewed: 17

আরো পড়ুন