Ridge Bangla

নতুন সরকার: মবের খবর কী?

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া আন্দোলন ক্রমান্বয়ে ছাত্র-জনতার হাত ধরে এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ওই আন্দোলনে ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার চূড়ান্ত বিজয় অর্জন ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে ৮ আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশে নানাবিধ সংস্কার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও সবকিছু ছাপিয়ে যে বিষয়টি বেশি আলোচনায় ছিল, তা হলো ‘মব ভায়োলেন্স’। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি মব ভায়োলেন্স দমনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্লিপ্ততাও যেন অপরাধীদের আরও বেশি উৎসাহ জুগিয়েছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শুধুমাত্র ২০২৫ সালে বাংলাদেশে মব ভায়োলেন্স বা ম্যাস বিটিংয়ের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৬০ জন মানুষ। এ সময় দেশে ধর্ম অবমাননা থেকে শুরু করে চুরি-ডাকাতির সন্দেহেও পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে সাধারণ মানুষকে। মবের হাত থেকে রক্ষা পায়নি মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিরাও। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর দলবদ্ধভাবে হামলা চালিয়ে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এই ধরনের মব তৈরি করে শুধু নিরপরাধ মানুষ হত্যাই নয়, করা হয়েছে চাঁদাবাজি, চালানো হয়েছে ভিন্নমতের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন। নানান সময়ে মবের শিকার হতে দেখা গেছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে, যা থেকে বাদ যায়নি স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও।

দলবদ্ধ আক্রমণের মাধ্যমে হওয়া এসব মব ভায়োলেন্স নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই নানা আলোচনা হয়েছে। সমালোচনার ঝড় উঠেছে টকশোর টেবিলে। এত কিছু সত্ত্বেও মব লিঞ্চিং দমনে অন্তর্বর্তী সরকারের তেমন কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। উল্টো শেষ সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ‘মব ভায়োলেন্স বলতে কোনো কিছু নেই’- এমন বক্তব্য যেন মব দমনে সরকারের দুর্বলতার কথা নগ্নভাবে আরও একবার প্রকাশ করেছে।

এই সমালোচনা-আলোচনার মধ্য দিয়েই গত ১২ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল সমর্থন পাওয়া বিএনপির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে ২০ বছর পর আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মতোই বিএনপির ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতেই নানা মহলে আলোচনায় রয়েছে মব ভায়োলেন্স। চলমান মবের মহামারীর মধ্যে দীর্ঘ দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরা বিএনপির অবস্থান ও কার্যপ্রণালী কী হবে, তা নিয়েই হচ্ছে আলোচনা।

মব নিয়ে সদ্য ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদকে প্রশ্ন করা হলে তিনি ঘোষণা দিয়ে জানিয়েছেন, ‘মব কালচারের দিন শেষ’। যা মব দমনে দেশবাসীকে আশার বাণী শোনানোর পাশাপাশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর উদ্বেগকেও কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ‘মব ভায়োলেন্স’ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। এখন দেশের সদ্য নতুন সরকার শুরুতেই মব সহিংসতা বন্ধের কথা বলছে। তাই প্রশ্ন উঠছে, সেটা করা কি আদৌ সহজ হবে? সহজ হলে তা কতটা সম্ভব?

তবে বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট অন্তত সেই কথা বলছে না। কারণ বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নানা কারণে অন্তত পাঁচজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। যা আপাতদৃষ্টিতে আমাদের সামনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কর্তৃক দেওয়া বক্তব্যের বিপরীত চিত্রই তুলে ধরছে। কিন্তু বিএনপি যেহেতু এখনো সরকার গোছানোসহ নানাবিধ কার্যকলাপে তাদের প্রাথমিক অবস্থা পার করছে, তাই মব ভায়োলেন্সের পরবর্তী চিত্র দেখার জন্য প্রশ্নটি ভবিষ্যতের জন্যই তোলা রইল।

This post was viewed: 27

আরো পড়ুন