দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। প্রায় ১৭ বছর পর একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ। সেই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে জাতীয় নির্বাচনের প্রচার কার্যক্রম। প্রচারের প্রথম দিনেই গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে নির্বাচনী উৎসবের আমেজ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ, মিছিল ও পোস্টার-লিফলেটে সরগরম ছিল দেশের রাজনীতি।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রার্থীরা মোট ২০ দিন নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারবেন। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত প্রচার কার্যক্রম চলবে। তবে এবারের নির্বাচনে আচরণবিধি প্রতিপালনের বিষয়ে কমিশন কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে নিবন্ধিত ৫১টি রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। দলীয় প্রার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ৭৩২ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৪৯ জন। সব মিলিয়ে ভোটের মাঠে লড়ছেন ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী। প্রতীকভিত্তিক হিসাবে ধানের শীষ প্রতীকে ২৮৮ জন, দাঁড়িপাল্লায় ২২৪ জন, হাতপাখায় ২৫৩ জন, জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকে ১৯২ জন এবং গণঅধিকার পরিষদের ৯০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে প্রার্থী হয়েছেন ৩২ জন।
প্রচারের প্রথম দিনে বড় রাজনৈতিক দলগুলোও কেন্দ্রীয়ভাবে মাঠে নামে। সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জনসভার মধ্য দিয়ে বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার শুরু করে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনের মিরপুর-১০ আদর্শ স্কুল মাঠে আয়োজিত জনসভার মাধ্যমে দলের প্রচার কার্যক্রমের সূচনা করেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তিন নেতার মাজার, কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে প্রচার শুরু করে। এ ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও নিজ নিজ আসনে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটতে শুরু করেন।
নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিএনপির ২৮৮ জন, জামায়াতে ইসলামীর ২২৪ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৫৩ জন, জাতীয় পার্টির ১৯২ জন, বাসদের ৩৯ জন, সিপিবির ৬৫ জন, জেএসডির ২৬ জন, জাসদের ৬ জনসহ বিভিন্ন ছোট-বড় দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। তবে নিবন্ধিত কয়েকটি দল এবারের নির্বাচনে প্রার্থী দেয়নি। আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় দলটির কোনো প্রার্থীও ভোটের মাঠে নেই।
এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। মনোনয়ন যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহার শেষে ভোটের লড়াইয়ে টিকে আছেন ১ হাজার ৯৯১ জন প্রার্থী। এর মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৬৫ জন, যা মোট প্রার্থীর প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ। ৫১টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৩০টিরই কোনো নারী প্রার্থী নেই। বড় দল জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকেও এবার কোনো নারী প্রার্থী দেওয়া হয়নি।
নারী প্রার্থীদের মধ্যে বিএনপির ঢাকা-১৪ আসনের প্রার্থী ও ‘মায়ের ডাক’-এর সংগঠক সানজিদা ইসলাম তুলি শাহ আলীর মাজার জিয়ারত করে প্রচার শুরু করেন। তিনি দারুস সালাম, টেকনিক্যাল মোড় ও গাবতলী এলাকায় গণসংযোগ করে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন। সানজিদা ইসলাম বলেন, মানুষ গতানুগতিক রাজনীতির পরিবর্তন চায়। গুম, খুন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই এবং ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠাই তার রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আফরোজা খানম রিতা তার বাবা সাবেক মন্ত্রী হারুনুর রশীদ খান মুন্নুর কবর জিয়ারতের মাধ্যমে প্রচার শুরু করেন। তিনি বলেন, মানিকগঞ্জের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। নাটোর-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলও বাবার কবর জিয়ারতের পর গণসংযোগে নামেন। এ ছাড়া ফরিদপুর, যশোর, ঝালকাঠি, শেরপুর, সিলেট ও মাদারীপুরসহ বিভিন্ন আসনে বিএনপির নারী প্রার্থীরা প্রচার কার্যক্রম শুরু করেছেন। জাতীয় পার্টি, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, সিপিবি ও বাসদের নারী প্রার্থীরাও মাঠে সক্রিয় রয়েছেন।
অন্যদিকে, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তিনি অভিযোগ করেন, তার কর্মীদের ওপর হামলা ও ভাঙচুর হলেও এখনো কোনো মামলা হয়নি। তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রশাসন নিরপেক্ষ না হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
প্রচারের প্রথম দিনেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ভোটারদের মধ্যে কৌতূহল ও আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হওয়ায় জনসম্পৃক্ততা বাড়ছে। তবে নির্বাচনী আচরণবিধি মানা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ- এই বিষয়গুলোই হবে আসন্ন নির্বাচনের বড় চ্যালেঞ্জ।