সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে একের পর এক অগ্নিসংযোগ ও নাশকতামূলক হামলার ঘটনা ঘটেই চলেছে। এসব হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে বাস, বিভিন্ন প্রকার যানবাহনসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা স্থাপনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাইরাল ভিডিও এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়া হামলাকারীদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতা-কর্মীদের বড় আকারের আর্থিক বিনিয়োগ, যা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে।
তদন্ত–সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, বাসে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ এবং ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে। এই অর্থের প্রধান উৎস হলো বিদেশে পলাতক নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা, যারা বিশ্বস্ত অনুসারীদের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে নাশকতার অর্থ সারা দেশে বিতরণ করছেন।
যারা নাশকতামূলক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন, তাদের কাজের ভিডিও প্রমাণ দেখার পরেই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকান থেকে চুক্তিকৃত অর্থ পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রতি বাসে আগুন দেওয়ার জন্য ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা, ককটেল নিক্ষেপের জন্য ৩,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা এবং ঝটিকা মিছিলে অংশগ্রহণের জন্য ৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। দূরবর্তী জেলা থেকে আসা অংশগ্রহণকারীরা সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচ্ছেন। জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে নাশকতা ঘটানো গেলে অর্থের পরিমাণ দ্বিগুণ পর্যন্ত হতে পারে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) মো. শফিকুল ইসলামের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ডেডিকেশন বুঝে টাকা দেওয়া হচ্ছে। দেশে থাকা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনেকেই এসব কাজ থেকে লাভবান হচ্ছেন। আমরা সম্প্রতি এক নেতাকে গ্রেপ্তারের পর জানতে পারি ৪টি ঝটিকা মিছিলের জন্য তাকে ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল। টাকা আসছে সেসব দেশ থেকে যেসব দেশে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা পলাতক রয়েছেন।
সম্প্রতি পাবনার একটি বাস ডিপোতে হেলমেট পরা পাঁচ যুবককে একটি বাসে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিতে দেখা যায়, যারা পুরো ঘটনার ভিডিও মোবাইলে ধারণ করে। এই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। গত ১৩ নভেম্বর পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার মোড়ে বাসে আগুন দেওয়ার অভিযোগে জনতা এক যুবককে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, উক্ত যুবক আগুন দেওয়ার প্রমাণ রেকর্ড করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সূত্রাপুর থানার সাধারণ সম্পাদক ফাহাদ বিল্লালের হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছিল। মুছে ফেলা সেই তথ্য পুনরুদ্ধারের জন্য তার মোবাইল ফরেনসিকের জন্য পাঠানো হয়েছে।
১৩ নভেম্বর ওই একই দিনে মিরপুরের শাহআলী বেড়িবাঁধ এলাকায় বাসে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন দেওয়ার সময় স্থানীয়দের ধাওয়ায় আবদুল্লাহ আল সাইফ (১৮) নামে এক তরুণ তুরাগ নদে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে মারা যান। তার বন্ধু রুদ্র মোহাম্মদ আমির সানি গ্রেপ্তার হন, তবে অপরজন পালিয়ে যান। তারা তিনজনই ৫,০০০ টাকার বিনিময়ে ঢাকা–১৪ নির্বাচনী এলাকায় একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার জন্য নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতার কাছে ভাড়ায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে মূলত ভাসমান মানুষ, মাদকাসক্ত, বেকার ও পথশিশুদের ভাড়া করা হচ্ছে। পুলিশের একটি গোপন প্রতিবেদনেও তালিকাভুক্ত আগুন সন্ত্রাসীদের মধ্যে ভাসমান অপরাধী ও বস্তিবাসীর সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও, ককটেল তৈরির জন্য কারিগরদের কাছে অর্ডার দেওয়া হচ্ছে। প্রতি ককটেল তৈরিতে প্রায় ১,০০০ টাকা খরচ পড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নাশকতার সমন্বয়কারীরা একসঙ্গে একাধিক ককটেলও অর্ডার দিচ্ছেন।