অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী জনগোষ্ঠী হলো পৃথিবীর প্রাচীনতম জনগোষ্ঠী। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে এরা পা রেখেছিল অন্তত ৫০,০০০ বছর পূর্বে। এই রহস্যঘেরা অভিযাত্রার সূচনা কোথায়? আর কীভাবে তাঁরা মহাসমুদ্র পেরিয়ে অজানা এক ভূখণ্ডে পাড়ি জমিয়েছিল?
সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব অনুসারে, আধুনিক মানুষের উদ্ভব ঘটেছিল আফ্রিকায়, প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে। তাদের পূর্বসূরি মানবপ্রজাতি- যেমন, হোমো ইরেক্টাস ও হোমো নিয়ান্ডারথাল আফ্রিকা থেকে বের হয়ে গিয়েছিল প্রায় ১৫ লক্ষ বছর আগেই। কিন্তু আধুনিক মানুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পরাস্ত হয়ে হারিয়ে গেছে তারা।
হোমো স্যাপিয়েন্সেরও অনেক আগেই আফ্রিকা ত্যাগের প্রচেষ্টা থাকলেও, তাতে কোনো স্থায়ী সাফল্য আসেনি। ইউরোপে যে আধুনিক মানুষেরা পরে বসতি গড়েছে, তারা মূলত আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য ঘুরে ইউরোপের এসেছে ৫৫ হাজার বছর আগে। অস্ট্রেলিয়ার দিকে যারা যাত্রা করেছিল, তাঁরা ইউরোপমুখী অভিবাসী প্রকল্পের অংশ ছিল না। স্বতন্ত্র ও প্রাচীন এই অভিবাসীরা এই পরিকল্পনা শুরু করেছিল প্রায় ৭০,০০০ বছর আগেই।
তাঁরা আফ্রিকার উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করে লেভান্ত অঞ্চলের মধ্য দিয়ে ভারতে, তারপর চীন হয়ে দক্ষিণে চলে আসে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। সে সময় সমুদ্রপৃষ্ঠ অধিক নিচু হওয়ায়, এই দীর্ঘ পথ স্থলভূমি দিয়ে অতিক্রম করা সম্ভব হয়। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শেষপ্রান্তে এসে দেখা দেয় নতুন এক পরীক্ষা। সামনে আসে বিশাল জলরাশি। সেই জলরাশির ওপারে ছিল এক বৃহৎ ভূখণ্ড ‘সহুল’, যার মধ্যে ছিল আজকের নিউগিনি, অস্ট্রেলিয়া ও তাসমানিয়া। সেদিকে এগোতে হলে পেরোতে হতো সমুদ্র।
আজকের আদিবাসী অস্ট্রেলীয়দের ডিএনএ বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে প্রায় ২.৫ শতাংশ নিয়ান্ডারথাল জিন বিদ্যমান। এই জিনিস ইঙ্গিত দেয়, তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ইউরেশিয়ার পথচলায় সেই বিলুপ্ত মানবপ্রজাতির সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়েছিল। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া পৌঁছাতে হলে তাঁদের পাড়ি দিতে হতো এক ভয়ংকর সমুদ্রযাত্রা, যেখানে তাঁরা জানতই না, ওপারে আদৌ কোনো স্থলভাগ আছে কিনা।
প্রমাণ মেলে, এই বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে পৌঁছায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার বছর পূর্বে। এই সময়কালই খাপ খায় অস্ট্রেলিয়ার মেগাফনা বিলুপ্তির সময়কালের সঙ্গে, যার পেছনে মানুষের আগমনকেই দায়ী করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই প্রাচীন যুগের কোনো নৌযান আজ আর আমাদের হাতে নেই। তবে সমুদ্রযাত্রার পদ্ধতি আন্দাজ করা যায়, আধুনিক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নৌচালনার কৌশল থেকে।
তাঁদের মাঝে দুই ধরনের নৌকা প্রচলিত থাকতে পারে। সেগুলো হলো, বার্ক ক্যানো ও ডাগআউট ক্যানো। বার্ক ক্যানো বানানো হয় গাছের ছাল দিয়ে, যা নদী বা জলাভূমি পেরোনোর জন্য উপযুক্ত। অন্যদিকে, ডাগআউট ক্যানো নির্মাণ করা করা হয় গাছের কাণ্ড থেকে। এতে ব্যবহৃত হয় প্যান্ডানাস পাতার তৈরি পাল ও কাঠের চপু। এমন নৌকায় দূরদূরান্তের জলপথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব। প্রাচীন যাত্রীরা সম্ভবত এসব নৌযানেই সমুদ্র পাড়ি দিয়েছিল। অথবা তাঁরা ভরসা করেছিল কাঠ ও লতাগাছ দিয়ে বাঁধা ভেলার ওপর।
২০১৭ সালে আদিবাসী মানুষের পুরনো চুলের নমুনা নিয়ে করা এক ডিএনএ গবেষণায় জানা যায়, অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে মানবগোষ্ঠী অত্যন্ত দ্রুত বিস্তার লাভ করেছিল। তাঁরা উপকূল ধরে অগ্রসর হয়ে পূর্ব দিকে নিউ সাউথ ওয়েলস ও ভিক্টোরিয়ার দিকে, আবার পশ্চিম দিকে গিয়ে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দক্ষিণের অ্যাডিলেড অঞ্চলে একত্রিত হয়। এই বিস্তার সম্পূর্ণ হতে সময় লেগেছিল এক হাজার বছরের মতো।
প্রতিটি গোষ্ঠী তখন নিজস্ব এলাকায় থিতু হবার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সেখানেই স্থায়ী হয়। ডিএনএ প্রমাণ বলে, একবার বসতি স্থাপনের পর তাঁদের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক বা পুনঃবিস্তারের প্রবণতা ছিল না বললেই চলে। এভাবেই শত শত ভাষাগোষ্ঠীর জন্ম হয়। এই ঘটনাপ্রবাহ কিছুটা আশ্চর্যজনক। কারণ, পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে নতুন জনসংখ্যার আগমন, কৃষির বিকাশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরবর্তী সময়েও বারবার স্থানান্তর ঘটেছে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় তেমন কিছু ঘটেনি। কেন?
গবেষকেরা মনে করেন, এর মূল কারণ হলো, অস্ট্রেলীয় আদিবাসীরা কখনো কৃষিনির্ভর হয়নি। তাঁরা চিরকাল শিকারি-সংগ্রাহী জীবনযাপন করে এসেছে। চাষবাসের ফলে যে অতিরিক্ত খাদ্য মজুত হয় এবং যার ভিত্তিতে জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তা এখানে ঘটেনি। ফলে নতুন আবাসস্থলের প্রয়োজন হয়নি। খরার কারণে ফসলহানি হলে, অন্য অঞ্চলে স্থানান্তরের ঘটনা ঘটে। কিন্তু সেখানে সেটাও ঘটেনি।
আজকের দিনে আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ান বলতে বোঝানো হয় মূলত স্বতন্ত্র দুইটি জনগোষ্ঠীকে। অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডের ‘ফার্স্ট ন্যাশন্স’ জনগণ এবং কুইন্সল্যান্ড উপকূলের সন্নিকটে অবস্থিত টরেস স্ট্রেইট আইল্যান্ডের অধিবাসীদের। তবে, টরেস প্রণালির বাসিন্দারা সরাসরি অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডের আদিবাসীদের বংশধর নন। বরং তারা মেলানেশীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত। এদের শারীরিক গঠন, ভাষা ও সংস্কৃতি অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ পলিনেশীয় জনগণের সঙ্গে, যাঁরা পরবর্তীতে হাওয়াই, সামোয়া, ও নিউজিল্যান্ডের মতো দ্বীপে বসতি স্থাপন করেন।
বলা হয়ে থাকে, টরেস প্রণালির অধিবাসীরা এই দ্বীপপুঞ্জে আগমন করে প্রায় ১০,০০০ বছরেরও আগে। কারণ তার আগ পর্যন্ত, নিউগিনি ও অস্ট্রেলিয়া ছিল এমন এক ভূখণ্ড, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের নিম্নতায় একে অপরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই অঞ্চলের জেনেটিক প্রমাণ থেকে বোঝা যায়, তাদের পূর্বপুরুষরা এশিয়ার দিক থেকে প্রায় ৪,০০০ থেকে ৩,০০০ বছর আগে এই এলাকায় আগমন করে।
এই মেলানেশীয় যাত্রীরা পরবর্তীতে সলোমন দ্বীপ হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডের আদিবাসীদের সঙ্গে তাঁদের কোনো জেনেটিক মেলবন্ধনের প্রমাণ পাওয়া যায় না, অর্থাৎ, দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত।
প্রায় ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে মেলানেশীয় ও পলিনেশীয়দের মধ্যে এক সাংস্কৃতিক বিভাজন দেখা দেয়। পলিনেশীয়রা তখন ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করে। তাঁরা প্রথমে টোঙ্গা ও স্যামোয়ার মতো পশ্চিম পলিনেশীয় দ্বীপে পৌঁছায়। পরে আরও পূর্ব দিকে হাওয়াই, নিউজিল্যান্ড, ও ইস্টার আইল্যান্ডে পৌঁছাতে তাঁদের প্রায় হাজার বছর সময় লেগে যায়। এই দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা সম্ভব হয়েছিল তাঁদের নৌপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির কারণে।
১৭৮৮ সালে ইউরোপীয়রা অস্ট্রেলিয়ায় আগমন করলে আদিবাসীদের দীর্ঘ ইতিহাসে আসে এক চরম বিভ্রাট। অনুমান করা হয়, সে সময় প্রায় ৩ থেকে ৯.৫ লক্ষ আদিবাসী জনগণ অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করতেন। কিন্তু ইউরোপীয় আগমনের পর সংঘর্ষ, রোগব্যাধি ও দমন-পীড়নের ফলে তাঁদের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়।
বর্তমানে আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ানরা দেশের মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩ শতাংশ, সংখ্যায় এক মিলিয়নেরও কম। তবুও, তাঁদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ভাষা, আধ্যাত্মিক বিশ্বাস, ও উপস্থিতি অস্ট্রেলিয়াকে এক অনন্য পরিচয় দেয়।
প্রথম জাতিগোষ্ঠী অস্ট্রেলিয়ানরা ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম সাহসী অভিযাত্রী। তাঁরা আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে এসে তৎকালীন সীমিত প্রযুক্তি নিয়েও সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এক অজানা ভূখণ্ডে পৌঁছেছিল। সেই অজানা ভূখণ্ড অস্ট্রেলিয়া তাঁদের কাছে কেবল বসতি নয়, বরং পরম এক বাসস্থান। তাঁরা এই ভূখণ্ডে বিস্ময়কর ধারাবাহিকতা ও পরিবেশগত ভারসাম্যের সঙ্গে বসবাস করে আসছে ৫০,০০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে।
সূত্র
১) When did Aboriginal people first arrive in Australia?
২) How Aboriginal Australians reach Australia?
৩) When did modern humans get to Australia?
৪) Aboriginal people migrate to Northern Australia through Asia
৫) Aboriginal mitogenomes reveal 50,000 years of regionalism in Australia