Ridge Bangla

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: ইউরোপ যেভাবে দুর্বল হচ্ছে

২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়া ‘বিশেষ অপারেশন’ শুরু করে করে তার পার্শ্ববর্তী দেশ ইউক্রেনে। রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের কোনোভাবেই পেরে ওঠার কথা ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও আমেরিকা বিভিন্নভাবে ইউক্রেনকে সহায়তা করে এখন পর্যন্ত টিকিয়ে রেখেছে।

ইউরোপ সরাসরি ইউক্রেনের পক্ষে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়ালেও তারা নানাভাবে দেশটিকে সাহায্য করে যাচ্ছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন কেবল সামরিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি পুরো ইউরোপকে ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে দুর্বল করে ফেলেছে অনেকাংশে। দশকের পর দশক ইউরোপ সামরিক সংঘাত থেকে দূরে থেকে যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বপ্ন দেখেছিল, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সেই স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের ফলে ইউরোপ অর্থনৈতিকভাবে বিশাল ধাক্কা খেয়েছে। জ্বালানির জন্য রাশিয়ার গ্যাস ও তেলের উপর ইউরোপ দীর্ঘ সময় ধরে বেশ নির্ভরশীল ছিল। অপরদিকে রাশিয়ার মোট জাতীয় আয় বা জিডিপির একটি বড় অংশ আসে জ্বালানি রপ্তানির মাধ্যমে। যুদ্ধের পর রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করার জন্য দেশটি থেকে জ্বালানি আমদানি করা কমিয়ে দেয়ার পাশাপাশি জ্বালানির নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। রা

শিয়া থেকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইউরোপের দেশগুলোকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হয়েছে, যার ফলে আগের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে দেশগুলোকে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি শিল্প কারখানার স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করেছে দারুণভবে।

মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গিয়েছে। এটি তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা তৈরি করছে। জার্মানির মতো শিল্পোন্নত দেশগুলো, যারা রাশিয়ার গ্যাসের উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল ছিল, তারা এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দারুণ হোঁচট খেয়েছে।

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সুদের হার বাড়াতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা অর্জন করা এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক দিক থেকে দেখলে এই যুদ্ধ ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোর যে দুর্বলতা ছিল, তা উন্মুক্ত করে দিয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর ন্যাটো চালু রাখার ব্যাপারে বেশ বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ন্যাটোর প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে বৃদ্ধি করলেও এটি যে ইউরোপকে পুরোপুরিভাবে নিরাপত্তা দিতে সক্ষম নয়, সেদিকটিও উঠে এসেছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে ইউরোপের অনেক দেশ তাদের সামরিক বাজেট বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে, যা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ কমিয়ে দিয়েছে ইতোমধ্যে। এছাড়া ইউরোপের সব দেশ সমানভাবে এই যুদ্ধকে গ্রহণ করেনি।

একদিকে পোল্যান্ড, বাল্টিক দেশগুলো এবং পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশ রাশিয়ার আগ্রাসনকে সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখছে, ইউক্রেনকে সর্বাত্মক সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে, পশ্চিম ইউরোপের কিছু দেশ, যেমন ফ্রান্স ও জার্মানি যদিও ইউক্রেনকে সরাসরিই সমর্থন করছে, তবুও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদের ব্যাপারে তাদের অনীহা দেখা যাচ্ছে। দৃষ্টিভঙ্গির এই ভিন্নতা তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আরও বেশি বিভাজনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সামাজিক ও মানবিক দিক থেকেও ইউরোপের উপর যুদ্ধের প্রভাব কম নয়। ইউক্রেন থেকে আসা লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে, যা এসব দেশের উপর সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।

জার্মানি, পোল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশ বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে স্বাগত জানিয়েছে, কিন্তু তাদের আবাসন, কর্মসংস্থান এবং শিক্ষার ব্যবস্থা করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। যদিও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অপরিহার্য, তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি সমাজে এবং জনসেবা ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও, যুদ্ধের কারণে খাবার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে, যা খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিচ্ছে এবং দৈনন্দিন জীবনে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলছে।

ইউরোপের জ্বালানি বৈচিত্র্যকরণ এবং রাশিয়ার উপর নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টা প্রশংসনীয় হলেও, এটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। রাতারাতি রাশিয়ার বিকল্প পাওয়া সম্ভব নয়। এই যুদ্ধের পর ইউরোপ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে, যেটি বিভিন্ন দিক থেকে অত্যন্ত দরকারি পদক্ষেপ। কিন্তু তারপরও এই উদ্যোগ রাতারাতি জ্বালানি ঘাটতি পূরণ করতে পারবে না। ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা ইউরোপ মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো মহাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য হুমকি।

অর্থনৈতিক মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, ভূ-রাজনৈতিক বিভেদ এবং শরণার্থী সংকট- সব মিলিয়ে ইউরোপ ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে ইউরোপকে কেবল আর্থিক ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করলেই চলবে না, বরং নিজেদের মধ্যে ঐক্য এবং সংহতি বজায় রেখে একটি সুসংহত কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

তথ্যসূত্র:

১) Consequences of the Russia-Ukraine War and the Changing Face of Conflict

২) Ukraine economic shock

৩) Is Europe the biggest loser in the Russia-Ukraine War?

This post was viewed: 31

আরো পড়ুন