ভারতের ফেডারেল রাজনীতিতে নতুন এক শক্তির ভারসাম্য গড়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন বিজেপি ও তাদের জোট এনডিএ বর্তমানে দেশের ২১টি রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে, যা ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭২ শতাংশের ওপর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করছে। স্বাধীনতার পর ইন্দিরা গান্ধী নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের সময়ের পর এই প্রথম কোনো রাজনৈতিক জোট এমন শক্তিশালী ফেডারেল অবস্থানে পৌঁছেছে।
মাত্র ১২ বছর আগেও বিজেপির হাতে ছিল সাতটি রাজ্য। ধারাবাহিক রাজনৈতিক কৌশল, জোট গঠন এবং সাংগঠনিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে দলটি আজকের এ অবস্থানে এসেছে। সর্বশেষ পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো জয় এবং আসামে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার মাধ্যমে এনডিএ-শাসিত রাজ্যের সংখ্যা ২১-এ পৌঁছেছে। যদিও ২০১৮ সালেও একবার এ সংখ্যায় পৌঁছানো গিয়েছিল, তবে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
ভারতের মানচিত্রে এখন এনডিএর প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। উত্তরাখণ্ড থেকে উত্তরপ্রদেশ ও বিহার হয়ে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে এ জোটের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গঙ্গা নদীর প্রবাহপথের অধিকাংশ অংশই এখন এনডিএ-নিয়ন্ত্রিত রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত, যা রাজনৈতিক প্রভাবের একটি প্রতীকী চিত্র তুলে ধরে।
২০১৪ সালের পর বিজেপির বিস্তার একটি সুপরিকল্পিত ধারা অনুসরণ করেছে। প্রথমে হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলোতে শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলা, এরপর উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জোট রাজনীতির মাধ্যমে প্রবেশ এবং পরবর্তীতে পশ্চিম ও পূর্ব ভারতে বিস্তার- এই কৌশলই দলটির সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি। মহারাষ্ট্র, উড়িষ্যা এবং সর্বশেষ পশ্চিমবঙ্গ এ সম্প্রসারণের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
তবে এ উত্থান সবসময় স্থিতিশীল ছিল না। ২০১৮ সালের পর মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিশগড়ে পরাজয়ের ফলে এনডিএর রাজ্য সংখ্যা দ্রুত কমে যায়। ২০২০ সালের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং মহামারীর প্রভাবে জোটের নিয়ন্ত্রণ ১৩টি রাজ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সে সময় দলটির দ্রুত বিস্তার নিয়ে সমালোচনাও দেখা দেয়।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি আসন হারালেও এনডিএ জোট ২৯৩টি আসন নিয়ে কেন্দ্রের ক্ষমতা ধরে রাখে এবং নরেন্দ্র মোদি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। এ ফলাফলের পর দলটি তাদের কৌশলে পরিবর্তন আনে। তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী করা, স্থানীয় ইস্যুকে গুরুত্ব দেওয়া এবং জোট ব্যবস্থাপনা আরও সুসংহত করার মাধ্যমে তারা পুনরায় শক্ত অবস্থানে ফিরে আসে।
২০২৬ সালের শুরুতে এনডিএ ১৯টি রাজ্য ও দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ক্ষমতায় ছিল। মে মাসের নির্বাচনের ফলাফল তাদের সেই অবস্থানকে আরও মজবুত করে ২১ রাজ্যে উন্নীত করেছে। তবে এ সাফল্যের সঙ্গে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ২১টি রাজ্যের মধ্যে ১৫টিতে বিজেপি এককভাবে ক্ষমতায় থাকলেও বাকি ছয়টি রাজ্যে জোটসঙ্গীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি রাজ্যে আঞ্চলিক দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ ভারতে এখনো বিজেপির প্রভাব সীমিত। কেরালায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় রয়েছে এবং তামিলনাড়ুতেও আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রাধান্য ধরে রেখেছে।
এই বিস্তৃত ফেডারেল উপস্থিতি নীতি নির্ধারণে এনডিএকে বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে। বৃহৎ অঞ্চলে সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হচ্ছে। তবে একই সঙ্গে জবাবদিহিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিটি রাজ্যের ভিন্ন চাহিদা ও সমস্যা মোকাবিলা করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।