Ridge Bangla

স্মার্টফোনে স্মার্ট ফাঁদ: সাইবার প্রতারণার ভয়াবহ বাস্তবতা

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই আধুনিক দুনিয়ায় মানুষ প্রচণ্ড ব্যস্ত, সময় তার গতি ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে চলেছে। সময়ের এই সংকটে আমরা সবকিছু চাই হাতের নাগালে। খাবারের অর্ডার থেকে শুরু করে ঔষধ পর্যন্ত আমরা অনলাইন থেকে ক্রয় করছি, কারণ সময়ের স্বল্পতা। সময়ের এই স্বল্পতায় সবকিছু আমাদের হাতের নাগালে নিয়ে আসার বড় উপাদান মোবাইল। একটি মোবাইলে আমরা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সংযুক্ত করে অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঘরে বসেই নিতে পারছি প্রায় সব ধরনের সেবা। আর এই অর্থ পরিশোধের জন্যই ফোনের সঙ্গে সংযুক্ত করছি বিকাশ, নগদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট।

এ ছাড়া আধুনিক নগর জীবনে সকাল-বিকালের ব্যস্ততায় শহুরে মানুষের মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে একপ্রকার যান্ত্রিকতা। অনেকেই এই যান্ত্রিকতার বাইরে একটু ফুসরত পেলে চেষ্টা করেন বিনোদন খোঁজার। এদের মধ্যে কেউ পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সময় কাটান, কেউ বা খেলা দেখা থেকে শুরু করে ফোনের বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে বিনোদন খোঁজেন।

এভাবেই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ফোনের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। ফোনের এই অপরিহার্য ব্যবহারকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের অসাধু চক্র, যারা প্রতারণা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ফাঁদে ফেলে মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। ফোনকে ঘিরে সাইবার প্রতারণা করতে বিভিন্ন মাধ্যমে ফোনে অনধিকার প্রবেশ করছে হ্যাকাররা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেটি আবার অন্য একটি ফ্রি অ্যাপের মাধ্যমে। হঠাৎ একটি এসএমএস আসার পর ফোনের স্ক্রিন ব্ল্যাক হয়ে যাচ্ছে, নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন ব্যবহারকারী। এভাবেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টের টাকা গায়েব হয়ে যাচ্ছে। নামে-বেনামে হচ্ছে এই ধরনের প্রতারণা।

ফোনকে কেন্দ্র করে হওয়া দুর্নীতির এমনই এক ঘটনা আমরা দেখতে পাই গত ২৭ মার্চ, যেখানে পিংকি নামের একজন একটি বিজ্ঞাপনে দেখতে পান ‘এনবি’ নামের একটি অ্যাপ ব্যবহারে বিশ্বের সব চ্যানেল দেখা সম্ভব। সেখান থেকে তিনি খেলা দেখার জন্য ফোনে ডাউনলোড করেন ওই অ্যাপটি। কিন্তু ডাউনলোড করার পরমুহূর্তেই তার মোবাইলের স্ক্রিন ব্ল্যাক হয়ে ফোনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ওই সিস্টেমের পেছনে থাকা হ্যাকারদের হাতে। এরপর শুরু হয় তার ফোনে সংযুক্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ লুটের মহাযজ্ঞ।

ভুক্তভোগী পিংকি বলেন, বিজ্ঞাপন দেখে অ্যাপটি ইনস্টল করলে আমার ফোন হ্যাং হয়ে যায়। পরে সেটি আনইনস্টল করার চেষ্টা করলে ফোনের স্ক্রিন সম্পূর্ণ ব্ল্যাক হয়ে বারবার রিস্টার্ট হতে থাকে। এরপর ফোনে একটি মেসেজ আসে যে অ্যাকাউন্ট থেকে ১৮ হাজার টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যাংক অ্যাকাউন্টের অ্যাপ চেক করলে দেখা যায় ব্যালেন্স ঠিক আছে। তবে এর তিন থেকে চার মিনিট পর একের পর এক মেসেজ আসতে থাকে। প্রথমে ৩ লাখ, পরে আবার ২ লাখ টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে চলে যায়। এভাবে পুরো লিমিট পর্যন্ত টাকা উত্তোলন করা হয়।

আমরা এই ধরনের দ্বিতীয় ঘটনা দেখতে পাই গত ১১ এপ্রিল দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে, যেখানে অসতর্কতায় ফোনে একটি অ্যাপ ইনস্টল করে প্রতারক চক্রের হাতে প্রায় অর্ধলাখ টাকা হারান চাঁদপুরের প্রদ্যুৎ কুমার আচার্যী (৪৯) নামে এক জ্যোতিষ গবেষক। তিনি বলেন, আমি ফোন ব্যবহারের সময় হঠাৎ অসাবধান হয়ে মোবাইলে একটি অ্যাপস ইনস্টল করলে মোবাইল হ্যাং হয়ে বন্ধ হয়ে যায়। টেকনিশিয়ানের মাধ্যমে পরে ফোন চালু করলে দেখতে পাই, আমার ফোন হ্যাকারদের দখলে। তারা আমার বিকাশে থাকা ১২ হাজার ৫০০ টাকা এবং ফোনে সোনালী ব্যাংকের সংযুক্ত অ্যাপ থেকেও ৩০ হাজার টাকা তুলে নেয়।

ফোনে প্রতারণার শিকার হয়ে অর্থ খোয়ানোর এই গল্পগুলো এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সম্মিলিত কার্যক্রমের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছে ডিএমপির সাইবার ইউনিট। তাদের তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিনই এ ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অগণিত মানুষ। গত এক মাসে তারা অন্তত ৩০টি সাইবার প্রতারণার অভিযোগ পেয়েছেন বলে জানা গেছে।

যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি সাইবার ইউনিট) সৈয়দ হারুন অর রশীদ এ ব্যাপারে জানিয়েছেন, হ্যাকিংসহ বিভিন্ন ম্যালওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর ব্যবহৃত ফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজের মতো করে ব্যবহার করছে হ্যাকাররা। ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা হাতিয়ে নিয়ে তা বিভিন্ন চ্যানেল হয়ে এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠাচ্ছে। এগুলোর পুরোটাই পর্দার আড়ালে থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে প্রতারক চক্র। কিছু ক্ষেত্রে এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে যে দেশের বাইরে, বিশেষ করে চীন থেকে এসব কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।

ফোনের অ্যাপের মাধ্যমে সাইবার প্রতারণা থেকে বাঁচতে সতর্কতা এবং সঠিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এ ব্যাপারে সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন,

অ্যাপ ডাউনলোডে সতর্কতা অবলম্বন করা: অফিসিয়াল স্টোর ব্যবহার করা, যেমন গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপ ডাউনলোড করা। অজানা ওয়েবসাইট বা থার্ড-পার্টি সোর্স থেকে APK ফাইল ডাউনলোড না করা।

অ্যাপ রিভিউ চেক: অ্যাপ ডাউনলোডের আগে তার রেটিং, রিভিউ এবং ডেভেলপার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ এড়িয়ে চলা, প্রয়োজন ছাড়া বেশি অ্যাপ ফোনে না রাখার পাশাপাশি সন্দেহজনক ও অপরিচিত অ্যাপ ইনস্টল না করা।

অ্যাপের অনুমতি যাচাই: কোনো অ্যাপকে অযৌক্তিক অনুমতি না দেওয়া। একটি সাধারণ ক্যালকুলেটর অ্যাপ যদি আপনার কন্টাক্ট লিস্ট বা ক্যামেরা ব্যবহারের অনুমতি চায়, তবে তা দেবেন না। অ্যাপের কাজ অনুযায়ী চাওয়া অনুমতির প্রয়োজন আছে কি না তা যাচাই করুন।

প্রাইভেসি সেটিংস: ফোন বা অ্যাপের প্রাইভেসি সেটিংসে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় লোকেশন বা ডেটা শেয়ারিং বন্ধ রাখুন।

নিয়মিত আপডেট ও নিরাপত্তা: ফোন এবং অ্যাপগুলো নিয়মিত আপডেট রাখুন। আপডেটগুলো নিরাপত্তা ঝুঁকি কমায়।

ফোন রিস্টার্ট: সপ্তাহে অন্তত একবার ফোন রিস্টার্ট বা বন্ধ করে চালু করুন, এতে ‘জিরো-ক্লিক’ হ্যাকিং ঝুঁকি কমে।

সতর্কতামূলক আচরণ: অচেনা মেসেজ, ইমেইল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় আসা কোনো লিংকে ক্লিক করবেন না, এমনকি যদি সেটি কোনো পরিচিত ব্যক্তি থেকেও আসে। ভুলবশত এমন কিছু করলে সঙ্গে সঙ্গে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দিন।

টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন: ইমেইল, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ব্যাংকিং অ্যাপে অবশ্যই টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন বা 2FA চালু করুন।

শক্তিশালী পাসওয়ার্ড: সব অ্যাপে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবেন না। শক্তিশালী ও ভিন্ন পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।

পাবলিক ওয়াই-ফাই বর্জন: পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে ব্যাংকিং বা আর্থিক লেনদেন করবেন না।

প্রতারণার শিকার হলে করণীয়: সন্দেহজনক অ্যাপ থাকলে দ্রুত ডিলিট করুন। পুলিশের সহায়তা নিতে হটলাইন নম্বর ৯৯৯-এ কল করুন বা নিকটস্থ থানায় জিডি করুন।

এ ছাড়া ফোনের মাইক্রোফোন ও ক্যামেরা সুরক্ষিত রাখা, পাবলিক ইউএসবি চার্জিং পোর্ট এড়িয়ে চলা ও ব্লুটুথ সংযোগ বন্ধ রাখার মতো কাজগুলো অবলম্বন করলে ফোনে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে।

ফরাসি দার্শনিক জঁ-পল সার্ত্রে একবার বলেছিলেন, The Gaze of Others। সোজা কথায় বললে, এটি এমন এক অবস্থা, যখন মানুষ মনে করে সে তার আশপাশে থাকা মানুষের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। মানুষ তাকে বিচার করছে, সে কেমন। এটি একটি তত্ত্ব হলেও বর্তমানে ইন্টারনেটের বিশাল দুনিয়া কিন্তু সার্ত্রের এই কথারই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি, যেখানে আমি-আপনি প্রতিনিয়তই কারও না কারও নজরদারির মধ্যে রয়েছি। একটু ভুলেই হতে পারে আমাদের সমূহ সর্বনাশ। তাই থাকতে হবে সচেতন, অন্যথায় অনিচ্ছাকৃত ভুলেও হতে পারে সর্বনাশা পতন।

This post was viewed: 23

আরো পড়ুন