Skip to main content

Ridge Bangla

যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, বাবার মৃত্যু, তারপরও দেশসেরা, গাজার সাবার অবিশ্বাস্য জয়ের গল্প

যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, বারবার বাস্তুচ্যুতি আর বাবাকে হারানোর গভীর শোক। এমন কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও হার মানেননি ১৮ বছর বয়সী সাবা রাবাহ। সব প্রতিকূলতাকে জয় করে ফিলিস্তিনের জাতীয় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা তাওজিহিতে বিজ্ঞান বিভাগে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে দেশসেরা হয়েছেন গাজার এই শিক্ষার্থী।

গাজার আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে অস্থায়ী একটি তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছিল সাবার পরিবার। চূড়ান্ত পরীক্ষার মাত্র কয়েক দিন আগে তাদের আশ্রয়স্থলের ঠিক বিপরীতের একটি বাড়িতে বোমা হামলা হয়। প্রাণ বাঁচাতে পরিবারকে আবারও স্থান পরিবর্তন করতে হয়। তাড়াহুড়োয় নিজেদের শেষ সম্বলও ফেলে যেতে বাধ্য হন তারা।

তবু পড়াশোনা থামাননি সাবা। এবারের তাওজিহি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগে তিনি পেয়েছেন ৯৯.৯ শতাংশ নম্বর। এই ফল তাকে পুরো ফিলিস্তিনের শীর্ষ শিক্ষার্থীর আসনে বসিয়েছে।

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে সাবা বলেন, “আমি ৯৯.৯ শতাংশ নম্বর পেয়েছি এবং বিজ্ঞান বিভাগে পুরো দেশের মধ্যে প্রথম হয়েছি।”

ফল প্রকাশের পর আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে আনন্দের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। স্বজন ও প্রতিবেশীরা তাকে ঘিরে উদযাপনে মেতে ওঠেন। গ্র্যাজুয়েশনের পোশাক পরে বাবার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে ফুল গ্রহণ করেন সাবা। তবে আনন্দের সেই মুহূর্তেও তার মুখে ছিল হারানোর বেদনার ছাপ।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজার শিক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় অধিকাংশ স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরে বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে হাজারো শিক্ষার্থী নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

এ বছরের তাওজিহি পরীক্ষা গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর, মিসরসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয়। যুদ্ধ শুরুর পর ৩ বছর পর প্রথমবারের মতো এ পরীক্ষা আয়োজন করা হয়। এতে প্রায় ৮৯ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেয়। বিজ্ঞান বিভাগের ২৫ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করেন সাবা।

সাবার বাবা ফায়েদ রাবাহ জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত একটি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। সাবা জানান, ২০২৪ সালের জুনে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার বাবা নিহত হন।

বাবার মৃত্যুর আগেই পরিবারকে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছিল। ইসরায়েলি বাহিনী আল-মাগাজি শরণার্থী শিবিরে প্রবেশের পর তারা ২ বার বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। পরে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে তাদের বাড়িও ধ্বংস হয়ে যায়।

বাবার মৃত্যুর পর এতবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে যে ঠিক কতবার ঘর বদলেছেন, সেটিও মনে করতে পারেন না সাবা।

তিনি বলেন, “এত বাস্তুচ্যুতি, এত ভয়ে ছিলাম… আমাদের বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। আমার বইয়ের অর্ধেক হারিয়ে ফেলেছি, কিন্তু কখনো আমার লক্ষ্য ছেড়ে দিইনি।”

পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়ও নিরাপদ ছিলেন না তিনি। পরীক্ষা শুরুর কয়েক দিন আগে পাশের বাড়িতে বোমা হামলার পর আবারও আশ্রয় বদলাতে হয়। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট না থাকায় পড়াশোনা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। কখনো ব্যক্তিগত ক্লাস কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অন্য এলাকায় যেতে হয়েছে, যেখানে পথের নিরাপত্তাও ছিল অনিশ্চিত।

সাবার স্বপ্ন চিকিৎসক হওয়া। তিনি বলেন, “আমার লক্ষ্য মেডিকেল স্কুলে ভর্তি হওয়া, এটাই আমার বাবার স্বপ্ন ছিল আমার জন্য।”

তিনি আরও জানান, চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনার জন্য পূর্ণ বৃত্তি অর্জন করাই এখন তার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

সাবার মা, ৫২ বছর বয়সী ফেরিয়াল আহমেদ রাবাহ বলেন, দীর্ঘ শোক আর দুর্ভোগের পর মেয়ের এই সাফল্য তাদের পরিবারে নতুন আনন্দ ফিরিয়ে এনেছে। তিনি জানান, অনেক সময় মোবাইল ফোনের আলোয় বসেই পড়াশোনা করেছে সাবা।

এএফপিকে তিনি বলেন, “এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি আশা করেছিলাম সে সেরা শিক্ষার্থীদের একজন হবে, কিন্তু সে পুরো ফিলিস্তিনের সেরা শিক্ষার্থী হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধ, বাবার মৃত্যু এবং বারবার বাস্তুচ্যুতির মতো কঠিন সময়ের মধ্যেও মেয়ের এই অর্জন তাদের পরিবারে নতুন আশার আলো হয়ে এসেছে।

This post was viewed: 6

আরো পড়ুন