বিশ্বের জ্বালানি মানচিত্রে মধ্যপ্রাচ্য এক অনিবার্য নাম। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের বিশাল তেল ও গ্যাসের ভাণ্ডার কেবল এই দেশগুলোর অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করেনি, বরং তা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির মোড়ও ঘুরিয়ে দিয়েছে, সচল রাখছে অর্থনীতিকে। যে কারণে আজ এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলেও ধাক্কা খায় বিশ্ব অর্থনীতি। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, বিশ্বের অন্য সব অঞ্চলের তুলনায় এই নির্দিষ্ট অঞ্চলটি কীভাবে এত বিশাল জ্বালানি সম্পদের অধিকারী হলো?
প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার আগে আমাদের একটু বিজ্ঞান-সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন করতে হবে। জানতে হবে হাইড্রোকার্বন সম্পর্কে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সম্পদ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে হাইড্রোকার্বনের বিষয়টি বারবার আসবে। হাইড্রোকার্বন হলো কার্বন ও হাইড্রোজেন দ্বারা গঠিত একপ্রকার সরলতম জৈব যৌগ। এগুলো মূলত খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান, যা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
গঠন ও বন্ধনের ওপর ভিত্তি করে হাইড্রোকার্বন সম্পৃক্ত (অ্যালকেন) ও অসম্পৃক্ত (অ্যালকিন, অ্যালকাইন) এবং অ্যারোমেটিক শ্রেণিতে বিভক্ত। পেট্রোলিয়ামজাত জৈব জ্বালানির মুখ্য উপাদান হলো সম্পৃক্ত হাইড্রোকার্বন।
এবার আসুন জেনে নিই, কীভাবে এই অঞ্চলটি এত বিশাল জ্বালানি সম্পদের অধিকারী হলো। আধুনিক ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানের গবেষণায় উঠে এসেছে, এই অঞ্চলে সমৃদ্ধ জ্বালানি ভাণ্ডার থাকার পেছনে রয়েছে লক্ষ লক্ষ বছরের এক অনন্য প্রাকৃতিক কার্যপ্রক্রিয়ার ইতিহাস।
গবেষণায় দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই অঢেল সম্পদের প্রধান উৎস হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত অ্যারাবিয়ান প্লেট এবং উত্তরে ইউরেশীয় প্লেটের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সংঘর্ষ এই অঞ্চলের শিলাস্তরে হাইড্রোকার্বন জমা হওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।
প্রায় ৩৫ মিলিয়ন বছর ধরে চলা এই ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন অঞ্চলটিকে বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি মজুত ভাণ্ডারে পরিণত করেছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ৩০টিরও বেশি তেল ক্ষেত্র রয়েছে, যেগুলোর প্রতিটিকে বলা হয় সুপারজায়ান্ট। এই ক্ষেত্রগুলোর প্রতিটিতে অন্তত পাঁচ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল রয়েছে।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এই অঞ্চলের শিলার ছিদ্রতা এবং হাইড্রোকার্বন ধরে রাখার সক্ষমতা বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় বহুগুণ বেশি। সহজ উৎপাদন প্রক্রিয়া ও মাটির গভীরে টেকটনিক প্লেটের চলমান সংঘর্ষের ফলে বিদ্যমান উচ্চচাপের কারণে এখান থেকে তেল উত্তোলন সাশ্রয়ী ও কার্যকর।
জ্বালানি সম্পদের সঙ্গে এই অঞ্চলের মানুষের পরিচয় অনেক প্রাচীন। বরফযুগের শেষে পারস্য উপসাগর গঠিত হওয়ার সময় থেকেই নদী ও উপত্যকায় প্রাকৃতিকভাবে তেলের নিঃসরণ ঘটত। হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মের বহু আগে থেকেই এখানকার মানুষ নৌকা পানিনিরোধক করতে ও স্থাপত্যের গাঁথুনিতে বিটুমিন ব্যবহার করত। সর্বশেষ ১৯০৮ সালে আধুনিক যুগে ইরানের মাটিতে প্রথম বাণিজ্যিক তেলখনি আবিষ্কারের পর থেকেই বিশ্বজুড়ে এই অঞ্চলের গুরুত্ব সম্পূর্ণ বদলে যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে, যেমন রাশিয়ার পশ্চিম সাইবেরিয়া বা যুক্তরাষ্ট্রের পারমিয়ান বেসিনে তেল ও গ্যাসের বড় মজুত আবিষ্কৃত হলেও, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সেগুলোর তুলনা চলে না। উৎপাদনের হার, মজুতের বিশালতা এবং উত্তোলনের সহজলভ্যতা- এই তিন দিক থেকেই মধ্যপ্রাচ্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিতে পরিণত হয়েছে।