পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। ৪ মে ফল প্রকাশের পর রাত থেকেই কলকাতাসহ বিভিন্ন জেলায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর, গুলি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে।
প্রথম দফার সহিংসতার সূত্রপাত ঘটে ফল ঘোষণার পরপরই। অভিযোগ উঠেছে, বিভিন্ন এলাকায় বিজয় উদযাপন ও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশের নামে দলীয় কার্যালয় ও বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। কোথাও কোথাও পুলিশ বাধা দিতে গেলে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা উত্তর চব্বিশ পরগনার ন্যাজাটে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ভরত প্রসূন করের গুলিবিদ্ধ হওয়া। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাজবাড়ি এলাকায় বিজেপি ও তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ থামাতে গেলে একটি বাড়ি থেকে গুলি ছোড়া হয়। সেই গুলিতে ওসির পায়ে আঘাত লাগে। তার সঙ্গে থাকা এক কনস্টেবলও গুলিবিদ্ধ হন। আহত দুই পুলিশ সদস্যকে কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ভাঙড় এলাকায় পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এখানে বিজয়ী রাজনৈতিক পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, বাড়ি ভাঙচুর ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। একাধিক এলাকায় দলীয় কার্যালয় দখল ও ধ্বংসের অভিযোগও পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রাতভর আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটাতে হয়েছে।
হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে এক বিজেপি কর্মীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহত ব্যক্তির নাম যাদব বর (৪৮)। তিনি ভোটের ফলাফলের পর আনন্দ উদযাপনে অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা যায়। পরে তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ। ঘটনায় একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
অন্যদিকে বীরভূম জেলার নানুর এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের এক কর্মী আবির শেখকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে একা পেয়ে আক্রমণ করা হয়। এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
মুর্শিদাবাদের ডোমকল এলাকায় সিপিএম কর্মী শফিকুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হন। অভিযোগ অনুযায়ী, বাড়ি ফেরার পথে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। তাকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনায় রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগও উঠেছে। বারুইপুর, কৃষ্ণনগর, বর্ধমান, শিলিগুড়িসহ একাধিক জায়গায় দলীয় অফিসে হামলার ঘটনা ঘটে। কোথাও কোথাও পতাকা ছিঁড়ে ফেলা ও আসবাবপত্র ধ্বংস করা হয়। তৃণমূলের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার জন্য বিরোধী দলকে দায়ী করা হলেও বিজেপি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
শিলিগুড়িতে মেয়র গৌতম দেবের ওয়ার্ডেও দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় তৃণমূল নেতারা অভিযোগ করেন, সংগঠিতভাবে হামলা চালিয়ে কার্যালয়ের ভেতরের আসবাবপত্র নষ্ট করা হয়েছে।
এদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই তাদের কর্মীদের ওপর ব্যাপক হামলা চলছে। তার দাবি অনুযায়ী, বহু পার্টি অফিস ভাঙচুর করা হয়েছে এবং বহু কর্মীর বাড়িতে হামলা হয়েছে। তিনি দলীয় কর্মীদের শান্ত থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করেছে, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য তাদের দায়ী করা হচ্ছে এবং এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য রাজ্য প্রশাসনের প্রতি দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি।
রাজ্য প্রশাসন জানিয়েছে, বিভিন্ন জায়গায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। সহিংসতার ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে এবং দোষীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
ফল ঘোষণার পর শুরু হওয়া এই সহিংসতা এখন রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশকে গভীর সংকটে ফেলেছে। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, আর রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে।