বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অমর পুরুষ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়েছে। ১৮৬১ সালের ২৫ বৈশাখ (৮ মে) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা এই মহামানবের জন্মদিনে দেশে-বিদেশে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তাকে স্মরণ করা হয়েছে।
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বিশ্বকবির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (৭ মে) সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও দর্শনের মানবিক দিক তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিকর্ম আজও মানবতা, শান্তি, প্রেম ও প্রকৃতির বার্তা বহন করে চলেছে। তার সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকর্ম বাঙালির চিন্তা ও সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যিক জীবন ছিল বহুমাত্রিক ও সমৃদ্ধ। অল্প বয়স থেকেই তিনি লেখালেখিতে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে বাংলা সাহিত্যকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। তার কাব্যগ্রন্থ ‘গীতাঞ্জলি’, ‘সোনার তরী’, ‘বলাকা’ বাংলা কবিতার ধারাকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দেয়। উপন্যাস ‘গোরা’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘শেষের কবিতা’ বাংলা গদ্যসাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করে। ছোটগল্প ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘পোস্টমাস্টার’, ‘ছুটি’ আজও পাঠকের হৃদয়ে গভীরভাবে স্থান করে আছে।
নাট্যসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের অবদানও অসাধারণ। ‘রক্তকরবী’, ‘ডাকঘর’, ‘চণ্ডালিকা’ তার চিন্তাশীল ও মানবিক নাট্যধারার উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি শুধু সাহিত্যিকই নন, ছিলেন একাধারে সংগীতস্রষ্টা, চিত্রশিল্পী ও দার্শনিক। তার রচিত গান ‘রবীন্দ্রসংগীত’ আজও বাংলা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
শিক্ষা ও সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তিনি শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষার সমন্বয়ে একটি মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তার শিক্ষাদর্শ ছিল প্রকৃতি, স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার ওপর ভিত্তি করে।
ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তার অবস্থানও ইতিহাসে স্মরণীয়। ১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত ‘নাইটহুড’ উপাধি তিনি প্রত্যাখ্যান করেন, যা তার প্রতিবাদী চেতনার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও সারদা সুন্দরী দেবীর ১৫ সন্তানের মধ্যে ১৪তম। শৈশব থেকেই তিনি সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। পরিবারের সাহিত্য ও শিল্পচর্চার আবহ তার সৃজনশীলতাকে বিকশিত করে। বাংলার প্রকৃতি, নদী ও পল্লীজীবনের গভীর অভিজ্ঞতা তার লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে।
১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার লাভ করেন, যা বাংলা সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয়। তিনি প্রথম এশীয় হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব গভীর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তার গান ও ভাবনা মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে তার লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়ে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে আছে।
জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিনব্যাপী কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ছায়ানটসহ বিভিন্ন সংগঠন আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ, সংগীতানুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বকবিকে স্মরণ করছে।