Ridge Bangla

নোনা জলের কান্না: সাতক্ষীরা-খুলনা উপকূলের জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জীবন সংগ্রাম

​বাংলাদেশের মানচিত্রের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণটি আজ এক অদৃশ্য যুদ্ধের ময়দান। একদিকে সুন্দরবনের গভীর অরণ্য, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশি। এই দুইয়ের সন্ধিস্থলে অবস্থিত সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি এবং খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলা। এক সময় এই জনপদ ছিল ধান ও মাছের প্রাচুর্যে ভরা। কিন্তু গত দুই দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়াবহ রূপ প্রত্যক্ষ করছে এই অঞ্চলের মানুষ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নোনা জলের অনুপ্রবেশ এবং ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় এখানকার জনজীবনকে করে তুলেছে বিপর্যস্ত। আজ তারা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার নয়, বরং নিজ দেশে পরবাসী হওয়া এক বিশাল ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ জনগোষ্ঠী।

​নোনা জলের অভিশাপ ও কৃষি ধ্বংস

​উপকূলীয় এই জেলাগুলোতে এক সময় দিগন্তজোড়া ফসলের মাঠ ছিল। কিন্তু ২০০৯ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘আইলা’ সব ওলটপালট করে দেয়। বাঁধ ভেঙে নোনা জল ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। সেই নোনা জল আজ ১৫ বছর পরেও পুরোপুরি নামেনি। মাটির লবণাক্ততা এত বেশি বেড়ে গেছে যে, সেখানে এখন আর আগের মতো ধান ফলে না। কৃষকরা নিরুপায় হয়ে ফসলি জমিতে শুরু করেছেন নোনা জলের বাগদা চিংড়ির চাষ। কিন্তু এই ঘের সংস্কৃতি পরিবেশের আরও ক্ষতি করছে। মিষ্টি পানির অভাবে গাছপালা মরে যাচ্ছে, এমনকি গৃহপালিত পশুপাখিও টিকে থাকতে পারছে না। নোনা পানি এখন কেবল জমিতে নয়, মানুষের ভাতের থালা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবহারের পানিতেও মিশে গেছে।

​ঘূর্ণিঝড়ের চক্রবৃদ্ধি হার ও ঘর হারানো মানুষ

​সিডর, আইলা, আম্পান, ইয়াস, সিত্রাং, মোখা, রিমাল- তালিকাটি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আগে যেখানে ১০-১৫ বছর পর পর বড় কোনো দুর্যোগ আসত, এখন প্রতি বছরই এক বা একাধিক ঘূর্ণিঝড় উপকূলের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে। সাতক্ষীরার গাবুরা বা পদ্মপুকুর ইউনিয়নের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিটি পরিবারই অন্তত কয়েকবার তাদের ঘর হারিয়েছে। বারবার নতুন করে ঘর বাঁধার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলছেন তারা। বাঁধ ভেঙে যখন নোনা জল ঢোকে, তখন মানুষ আশ্রয় নেয় রাস্তার ওপর বা সাইক্লোন শেল্টারে। মাসের পর মাস নোনা জলের ওপর মাচা করে তাদের বসবাস করতে হয়। এই অনিশ্চয়তা থেকেই মানুষ বেছে নিচ্ছে দেশান্তরের পথ।

​নারীদের শরীরে লবণের ক্ষত

​জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে করুণ শিকার হচ্ছেন উপকূলের নারীরা। রান্নাবান্না ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য তাদের দীর্ঘক্ষণ নোনা পানিতে থাকতে হয়। দূর-দূরান্ত থেকে সংগ্ৰহ করতে হয় সুপেয় পানি। নোনা জলের কারণে এই অঞ্চলের নারীদের মধ্যে জরায়ুর রোগ, চর্মরোগ এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের ভয়াবহ সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এমনকি গর্ভাবস্থায় নোনা পানি ব্যবহারের ফলে অনেক নারী অকালে গর্ভপাতের শিকার হচ্ছেন অথবা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন। উপকূলের নারীদের জরায়ু কেটে ফেলার হার দেশের অন্য যেকোনো অঞ্চলের চেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। এটি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, এটি সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের এক নিষ্ঠুর সামাজিক প্রতিফলন।

অভিবাসন: ভিটেমাটি ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে

​যখন কৃষি নেই, সুপেয় পানি নেই এবং মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও বারবার প্রকৃতি কেড়ে নিচ্ছে, তখন মানুষের সামনে একটিই পথ খোলা থাকে- অভিবাসন। প্রতি বছর সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলীয় এলাকা থেকে হাজার হাজার মানুষ কাজের সন্ধানে ঢাকা, খুলনা বা চট্টগ্রামের বস্তিগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছে। সাতক্ষীরার অনেক গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। তারা ইটভাটায় বা শহরের পোশাক কারখানায় নামমাত্র মজুরিতে কাজ করছেন। যারা এক সময় নিজের জমির মালিক ছিলেন, তারা আজ শহরের ঘিঞ্জি বস্তিতে ভাড়াটিয়া হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু হতে পারে, যার একটি বড় অংশই হবে এই উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ।

​অস্তিত্বের লড়াই ও অভিযোজন

​এত প্রতিকূলতার মাঝেও কিছু মানুষ মাটি কামড়ে পড়ে আছেন। তারা লোনা পানি সহনশীল ধানের চাষ করছেন, রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং বা বৃষ্টির পানি ধরে রাখার মাধ্যমে পানির সংকট মেটানোর চেষ্টা করছেন। অনেক স্থানে ‘বক্স কালভার্ট’ বা উন্নত বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে নোনা জল ঠেকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিশ্বব্যাপী সংকটের কাছে স্থানীয় এই প্রচেষ্টাগুলো সমুদ্রের বালুকণার মতো ক্ষুদ্র। সাতক্ষীরা-খুলনার এই সংকট কেবল বাংলাদেশের নয়, এটি পুরো বিশ্বের শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের এক চরম চড়া মূল্য।

​সাতক্ষীরা ও খুলনার উপকূলীয় মানুষ আজ কেবল জলবায়ু পরিবর্তনের কথা বইয়ের পাতায় পড়ে না, তারা এটি হাড়েমজ্জায় অনুভব করে। তাদের নোনা জলের কান্না বঙ্গোপসাগরের গর্জনে ঢাকা পড়ে যায় ঠিকই, কিন্তু তাদের উদ্বাস্তু হওয়ার মিছিলটি আমাদের সভ্যতার এক বড় পরাজয়। এই জনপদকে রক্ষা করতে হলে কেবল ত্রাণের বস্তা নয়, বরং স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ, সুপেয় পানির ব্যবস্থা এবং জলবায়ু সহনশীল কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা প্রয়োজন। বিশ্ব নেতাদের কাছে আজ দাবি তোলার সময় এসেছে- আমাদের এই মানুষগুলো যেন নিজ দেশে আর উদ্বাস্তু না হয়। উপকূলের এই অস্তিত্বের লড়াই যেন বিশ্ববিবেকের কানে পৌঁছায়, সেটাই হওয়া উচিত আমাদের আজকের অঙ্গীকার।

This post was viewed: 13

আরো পড়ুন