Ridge Bangla

ঢাকা ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি: প্রস্তুতির খাতায় নম্বর কত?

২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে ঢাকার অট্টালিকাগুলোর দিকে তাকালে একধরনের অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করে। মাটির নিচের টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া আর আমাদের ভগ্নদশার পরিকল্পনাহীন ভবনগুলোর জালের মতো ছড়িয়ে থাকা কাঠামোর যে সহাবস্থান, তা যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন যে, বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্য বাংলাদেশ, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি আসলেই প্রস্তুত? প্রস্তুত থাকলে সেই খাতায় আমাদের নম্বর কত?

বাংলাদেশের সদ্যগত অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, ঢাকার ৯০ শতাংশ ভবন বিল্ডিং কোডের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। এছাড়া গত ২১ নভেম্বর পাঁচ দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্পের পর রাজউক জানায়, গত কিছু মাসে কয়েক দফায় ভূমিকম্প হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে জরিপ চালিয়ে তারা ঢাকায় ৩০০টি ভবনকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যা রাজধানী ঢাকার ভূমিকম্প মোকাবেলায় ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

ভূ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থিত। এগুলো হলো ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট এবং বার্মিজ প্লেট। ঢাকা থেকে ২০০–২৫০ কিলোমিটার দূরে ডাউকি ফল্ট এবং নিকটবর্তী মধুমতী ফল্ট লাইনের সক্রিয়তা যেকোনো সময় রিখটার স্কেলে ৭ বা তার বেশি মাত্রার কম্পন তৈরি করতে পারে।

এর বাইরেও দেশের বিভিন্ন স্থানে একাধিক সক্রিয় চ্যুতি রেখা রয়েছে। যেমন, মিয়ানমার থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত প্লেট বাউন্ডারি ১ অঞ্চলে ১৭৬২ সালে ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। নরসিংদির ওপর দিয়ে যাওয়া আরেকটি চ্যুতি রেখা প্লেট বাউন্ডারি ২, যেখানে অতীতে ৭ মাত্রার কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। সিলেট অঞ্চলের প্লেট বাউন্ডারি ৩। এই স্থানে ১৯১৮ ও ১৯৬৯ সালে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। এছাড়া ১৮৯৭ সালের ৮.১ মাত্রার ডাউকি ফল্ট এবং ১৮৮৫ সালের ৭.১ মাত্রার মধুপুর ফল্টের ভূমিকম্প ইতিহাসে বড় সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত।

গবেষকদের মতে, এসব ফল্ট লাইনের অনেকগুলোতেই নির্দিষ্ট বিরতিতে বড় ভূমিকম্প ঘটে; কোথাও ৩৫০ বছর, কোথাও আবার ৯০০ বছর পর। ফলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের কম্পনের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এর চেয়েও উদ্বেগজনক হলো ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ বা অদৃশ্য চ্যুতি রেখা। এগুলো ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না, ফলে সাধারণ মানচিত্রে শনাক্ত করা কঠিন। বাংলাদেশে অন্তত দুটি ব্লাইন্ড ফল্ট চিহ্নিত হয়েছে, একটি ময়মনসিংহ অঞ্চলে, অন্যটি রংপুরে। এই ধরনের ফল্ট থেকে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই শক্তিশালী ভূমিকম্প উৎপন্ন হতে পারে, যা ঢাকার জন্যও ঝুঁকির কারণ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন ও ফল্ট লাইনের অবস্থান দুর্যোগ মোকাবেলায় পুরোপুরি প্রতিকূল না হলেও ভবন নির্মাণে অনিয়ম, ভরাট জমির প্রসার এবং অত্যধিক জনসংখ্যা শহরটিকে এক জটিল সমীকরণের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এমনিতেই গোটা শহরটি এখন জনসংখ্যার ফুটন্ত কড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। এর ওপর অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে জলাশয় ভরাট করা এলাকা ভূমিকম্পের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

এসব এলাকায় ভূমিকম্পের ফলে ‘সয়েল লিকুইফ্যাকশন’ বা মাটির তরলীকরণ ঘটতে পারে, যার ফলে বিপর্যয়ের আকার বাড়তে পারে বহুগুণ। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ডোবা ও জলাশয় ভরাট করে গড়ে উঠেছে বসুন্ধরা বা আফতাবনগরের মতো আধুনিক অঞ্চল। এসব এলাকার মাটি প্রাকৃতিকভাবে শক্ত নয়, মধুপুরের লাল মাটির মতো দৃঢ়তা এখানে নেই।

এ কারণে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের আগে মাটিকে উপযুক্তভাবে প্রস্তুত করা অত্যন্ত জরুরি। ‘গ্রাউন্ড ইমপ্রুভমেন্ট টেকনিক’ ব্যবহার করে মাটিকে শক্ত না করলে ভূমিকম্পের সময় ভবন অতিরিক্ত দুলে উঠতে পারে এবং ধসে পড়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে শুধু পাইলিং করেই ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, পাইল দেওয়ার পাশাপাশি মাটিকেও সমানভাবে প্রস্তুত করতে হবে। অন্যথায় দূরে কোথাও উৎপন্ন ভূমিকম্পের কম্পনও ভবনের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। আর কাছাকাছি উৎপন্ন ভূমিকম্প হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।

যেকোনো ধরনের ভূমিকম্প মোকাবেলায় আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বিদ্যমান অবকাঠামো। দেশে ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড থাকলেও তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভয়াবহ শিথিলতা লক্ষ্য করা যায়। এমন উদাহরণও রয়েছে, যেখানে ভবনের অনুমোদন ছিল দুই বা তিন তলার, কিন্তু বাস্তবে সেটি দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। অর্থাৎ ফাউন্ডেশন যেখানে দুই তলার জন্য তৈরি, সেখানে বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে আছে, যা সম্পূর্ণ অননুমোদিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ।

এছাড়া নতুন যেসব ভবন তৈরি হচ্ছে, সেখানেও অনিয়ম কম নয়। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, নকশা অনুযায়ী কাজ না করা এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে এসব ভবন ভূমিকম্প সহনীয় হিসেবে গড়ে উঠছে না। বিভিন্ন দুর্নীতিপরায়ণ আমলা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই অপরিকল্পিত নগরায়ণ আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে।

নগর বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার অনেক ভবনই কেবল উল্লম্ব ভার বহনের জন্য তৈরি, কিন্তু পার্শ্বচাপ বা ভূমিকম্পজনিত দোলনের চাপ সহ্য করার মতো করে নির্মিত নয়। ফলে সামান্য কম্পনেও এগুলো বড় ঝুঁকিতে পড়ে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে যে, জনবল ও কারিগরি সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা। সম্প্রতি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জানিয়েছে যে, টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টে যদি ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, তাহলে ঢাকা শহরের প্রায় ৪০ শতাংশ ভবন ধসে পড়তে পারে এবং মৃত্যু হতে পারে দুই লাখেরও বেশি মানুষের।

তাহলে প্রশ্ন আসে, ঢাকায় কি কোনো নিরাপদ এলাকা আছে?

এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকি নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপর; প্রথমত ভূতাত্ত্বিক গঠন, দ্বিতীয়ত অবকাঠামোগত মান। ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রায় এক হলেও মোঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে নদী, ডোবা, খাল ভরাট হয়ে তৈরি হওয়া অঞ্চলের চেয়ে উত্তর দিকের মধুপুরের লাল মাটি বেশ শক্ত। ঢাকার পুরান অংশে ঝুঁকি বেশি বলে ধারণা করা হলেও মূল সমস্যা কেবল পুরান ঢাকা নয়। পুরান ঢাকার বড় দুর্বলতা হলো সরু রাস্তা, যা দুর্যোগের সময় উদ্ধার তৎপরতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তবে আশ্চর্যের বিষয়, শত বছরেরও বেশি পুরনো কিছু ভবন এখনো টিকে আছে, যা প্রমাণ করে সঠিক নির্মাণমান থাকলে স্থায়িত্ব সম্ভব।

অন্যদিকে নতুন ঢাকার অনেক এলাকাই দুর্বল মাটির ওপর গড়ে উঠেছে, যেখানে নির্মাণগত ত্রুটি থাকলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। ফলে কোন এলাকা নিরাপদ আর কোনটি নয়, এটি নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন, যতক্ষণ না প্রতিটি ভবনের কাঠামোগত মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ, যা কোনো প্রকার পূর্বাভাস ছাড়াই এসে উপস্থিত হয়, তা মোকাবিলায় শুধু আতঙ্কিত হওয়া যাবে না, বরং বিজ্ঞানসম্মত প্রস্তুতির দিকে মনোনিবেশ করতে হবে।

ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশেষজ্ঞদের মতে করণীয়গুলো হলো:

  • রেট্রোফিটিং: ভেঙে ফেলে নতুন করে নির্মাণ করার চেয়ে বিদ্যমান গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলোকে কারিগরিভাবে শক্তিশালী করা অনেক বেশি কার্যকর।
  • মাইক্রোজোনেশন ম্যাপ: ঢাকার কোন এলাকায় মাটির অবস্থা কেমন এবং ভূমিকম্পের ঝুঁকি কতটা, তার একটি বিস্তারিত ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন।
  • ইমারজেন্সি রেসপন্স প্ল্যান: প্রতিটি এলাকার জন্য একটি নির্দিষ্ট উদ্ধার পরিকল্পনা থাকতে হবে। ভূমিকম্পের পর যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার বিকল্প ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
  • সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ: প্রতিটি নাগরিককে ‘ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড’ কৌশল জানতে হবে এবং নিয়মিত মহড়া চালু করতে হবে। এই কাজটি বিভিন্ন অফিস-প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজেও জরুরি ভিত্তিতে চালু করা প্রয়োজন।

দিনশেষে ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, এর ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয় আমাদের ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে। আমরা যদি বিল্ডিং কোড না মানি এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ চালিয়ে যাই, তবে সেই দায়ভার কেবল প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এখনই সময় কঠোরভাবে নীতিমালা প্রয়োগের এবং আমাদের অবকাঠামোকে ভবিষ্যতের ঝুঁকির বিরুদ্ধে ঢেলে সাজানোর। নইলে ভূমিকম্প মোকাবেলায় প্রস্তুতির খাতায় আমাদের নম্বর শূন্যই থেকে যাবে।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন