Ridge Bangla

ডিজিটাল বাংলাদেশের অদৃশ্য সংকট: ই-বর্জ্যের পাহাড়ে ভবিষ্যৎ

সম্প্রতি রাজধানীর গুলিস্তানে একটি কাজের জন্য গেলে সেখানকার ফুটপাত থেকে শুরু করে স্টেডিয়ামের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে দেখা মেলে হরেকরকম ইলেকট্রনিক ডিভাইসের। এসবের মধ্যে পুরোনো হেডফোন, চার্জার ও চার্জারের ক্যাবল, ঘড়ি, ট্রিমার, বিভিন্ন ধরনের ব্যাটারি, ব্লেন্ডার, ওয়াই-ফাই রাউটারসহ আরও অনেক পণ্য চোখে পড়ে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, এসবের মধ্যে বেশিরভাগই অকেজো ও মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব নিয়ে রাস্তার পাশে কিছু মানুষ বসে থাকছেন। বিষয়টি দেখে ই-বর্জ্যের কথা মনে পড়ে। কারণ গুলিস্তানে থাকা এসব পণ্য এখন পুরোপুরি ই-বর্জ্যে পরিণত হয়েছে।

সে কারণে এগুলোর থাকার কথা ই-বর্জ্যের ভাগাড়ে। যেখানে পণ্যগুলোকে সঠিক ব্যবস্থাপনায় রিসাইকেল করে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা, সেখানে ছিন্নমূল কিছু মানুষ এগুলো স্বল্পদামে বিক্রি করে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করছেন। যা বাড়াচ্ছে মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি।

স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, রাউটার, স্মার্ট ডিভাইস, গৃহস্থালি কিংবা চিকিৎসা ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবহার শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর এই অগ্রগতির আড়ালে নীরবে জন্ম নিচ্ছে এক ভয়াবহ পরিবেশগত সংকট: ই-বর্জ্য বা ইলেকট্রনিক বর্জ্য। পুরনো মোবাইল, নষ্ট কম্পিউটার, ভাঙা টেলিভিশন, ব্যাটারি, চার্জার কিংবা সার্কিট বোর্ডের স্তূপ আজ দেশের মাটি, পানি ও বাতাসকে দূষিত করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে এই ই-বর্জ্য জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হবে।

বাংলাদেশে প্রযুক্তিপণ্যের ব্যবহার গত এক যুগে বহুগুণ বেড়েছে। মোবাইল ফোনের বিস্তার, ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন ব্যবসা ও স্মার্ট ডিভাইসের সহজলভ্যতা ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজারকে দ্রুত সম্প্রসারিত করেছে। কিন্তু এসব পণ্যের আয়ু শেষ হওয়ার পর কী হবে, সে প্রশ্নে এখনো সুস্পষ্ট ও কার্যকর কোনো কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশে প্রতি বছর কী পরিমাণ ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও বেসরকারি সংস্থা ESDO-এর গবেষণা প্রতিবেদন “ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স পণ্য থেকে সৃষ্ট বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ২০১৮”-তে বলা হয়েছে, দেশে বছরে প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (BMPIA) তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০১৮ সালেই দেশে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার টন ই-বর্জ্য তৈরি হয়েছিল।

দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ই-বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর অধিকাংশই অনিয়ন্ত্রিত ও অনানুষ্ঠানিক উপায়ে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এতে সীসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো বিষাক্ত উপাদান মাটি ও পানিতে মিশে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-বর্জ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর অদৃশ্য দূষণ। প্লাস্টিক বা পলিথিনের মতো দৃশ্যমান না হলেও ইলেকট্রনিক বর্জ্যের রাসায়নিক উপাদান দীর্ঘমেয়াদে মানবদেহে প্রবেশ করে ক্যানসার, শ্বাসকষ্ট, কিডনি জটিলতা ও স্নায়বিক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে অনিরাপদ পরিবেশে ই-বর্জ্য পোড়ানো হলে বিষাক্ত ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে দেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ কোটি ৪৬ লাখ। একই সময়ে বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭২ হাজার। অর্থাৎ প্রায় প্রতিটি মানুষের হাতেই পৌঁছে গেছে মোবাইল ফোন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ মোবাইল ফোনের ব্যবহারযোগ্য মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। ফলে শুধু মোবাইল ফোন থেকেই বছরে প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে।

ই-বর্জ্য সমস্যার আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো শিশুশ্রম। রাজধানীর বিভিন্ন পুরনো ইলেকট্রনিক মার্কেট ও ভাঙারির দোকানে ঘুরে শিশু ও কিশোরদের খালি হাতে সার্কিট বোর্ড ভাঙা, তার পোড়ানো বা ব্যাটারি আলাদা করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে দেখা গেছে। তাদের বেশিরভাগই জানে না, এসব বর্জ্য থেকে নির্গত রাসায়নিক শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর। এ বিষয়ে চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘদিন এসব বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে থাকলে ফুসফুস, স্নায়ুতন্ত্র ও রক্তের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ে। যা বাড়াতে পারে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও।

অন্যদিকে, ই-বর্জ্য শুধু সংকট নয়, এটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে। WEEE সোসাইটি বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক আক্তার-উল আলম সম্প্রতি গ্লোবাল ই-বর্জ্য মনিটর ২০২৪-এর তথ্য উদ্ধৃত করে বলেন, “বাংলাদেশে মাথাপিছু প্রায় ২ দশমিক ২ কেজি ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়। যা আনুষ্ঠানিকভাবে শতভাগ পুনর্ব্যবহার করা গেলে এর আর্থিক মূল্য ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি হতে পারে।” আন্তর্জাতিক গবেষণা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যথাযথ পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি সম্ভাবনাময় শিল্পখাতে পরিণত হতে পারে। কারণ বাতিল ইলেকট্রনিক পণ্যের মধ্যেই রয়েছে তামা, স্বর্ণ, রূপা ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু।

সরকার ইতোমধ্যে “ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১” প্রণয়ন করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ই-বর্জ্যের বিষয়ে এক বক্তব্যে বলেছিলেন, টেকসই উৎপাদন ও আনুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। তিনি ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তবে বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো জানে না ই-বর্জ্য কোথায় ফেলতে হবে। অনেকেই পুরনো মোবাইল বা ব্যাটারি সাধারণ ডাস্টবিনে ফেলে দেন। ফলে এসব বর্জ্য শেষ পর্যন্ত ময়লার ভাগাড়, খাল কিংবা নদীতে গিয়ে মিশছে। পরিবেশবিদদের মতে, সচেতনতার অভাব ও কার্যকর সংগ্রহব্যবস্থার অনুপস্থিতি এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে এখন ‘সার্কুলার ইকোনমি’র ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে, যেখানে পুরনো প্রযুক্তিপণ্য পুনর্ব্যবহার করে নতুন পণ্য উৎপাদন করা হয়। বাংলাদেশেও এ ধরনের উদ্যোগ বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ডিজিটাল অগ্রগতির এই যুগে প্রযুক্তি আমাদের জীবন সহজ করেছে, এ কথা সত্য। কিন্তু সেই প্রযুক্তির বর্জ্য যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করে, তবে উন্নয়নের অর্জনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। তাই এখনই প্রয়োজন দায়িত্বশীল ব্যবহার, কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। অন্যথায় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর স্বপ্ন একদিন ই-বর্জ্যের স্তূপেই চাপা পড়ে যেতে পারে।

This post was viewed: 16

আরো পড়ুন