Ridge Bangla

গাজা রিভেরা: ট্রাম্প, টনি ব্লেয়ার আর উপসাগরীয় নেতাদের কাগুজে স্বর্গ

ইসরায়েলের উদ্ভাবন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী গিলা গ্যামলিয়েল গত ২২ জুলাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটা এআই ভিডিও পোস্ট করেন। এতে দেখা যায় গাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে বিলাসবহুল নগরী গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে গড়ে উঠেছে বিশাল বিশাল সব অত্যাধুনিক অট্টালিকা, যার মাঝে “ট্রাম্প টাওয়ার”-ও আছে। সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় ইসরায়েলিরা হাস্যজ্জ্বোলভাবে রেস্টুরেন্টে বসে খাচ্ছে আর আড্ডা দিচ্ছে। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর ইসরায়েল প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকেও সমুদ্র তীরে সস্ত্রীক হাঁটতে দেখা যাচ্ছে।

এর আগে বছরের শুরুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে একটা এআই ভিডিও শেয়ার দিয়েছিলেন, যেখানে দেখা যায় গাজাকে নতুনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। দুই ভিডিওর মাঝে গাজাকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি আরেকটি সাদৃশ্য আছে। সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার ফিলিস্তিনিদের কোনো স্থান নেই। এই ভোগবিলাস আর সাম্রাজ্য কেবল জায়নবাদী আর ইহুদিদের জন্যই সীমাবদ্ধ। এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্প কেবল এআই ভিডিওতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, এর বাস্তবায়নের জন্যও তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। আর এটা করা হবে ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে উচ্ছেদের মাধ্যমে। এটা যেন ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আবার ১৯৪৮ সালের ‘নাকবা’র ঘটনায়, যখন ৭,৫০,০০০ ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে ইসরায়েল নামক অবৈধ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।

গাজায় শিশুরা অনাহারে কঙ্কালে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন করে শিশু মারা যাচ্ছে। দক্ষিণ গাজায় তথাকথিত “মানবিক শহর” নামে আদতে একটা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প গড়ে তোলা হয়েছে, যেখান থেকে গাজাবাসীদের “স্বেচ্ছায়” দেশত্যাগে উদ্বুদ্ধ করা হবে। এছাড়া বাসভবন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া তো সেখানকার নিত্যদিনের দৃশ্য। ২০২৩ সালের  ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় ইসরায়েলের আক্রমণে ৬০,০০০ এরও বেশি ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। এই পরিকল্পিত গণহত্যা ফিলিস্তিনিদের জন্য ট্রাজেডি হলেও ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের পশ্চিমা বিশ্ব আর তাদের তাবেদার কিছু আরব রাষ্ট্রগুলোর জন্য তা ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক।

ট্রাম্প বছরের শুরুতে যে “গাজা রিভেরা” পরিকল্পনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছে টনি ব্লেয়ার ইন্সটিটিউট, যা যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নামে পরিচালিত। এতে ১০টি মেগাপ্রজেক্ট রাখা হয়েছে, যা বিশেষভাবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উপসাগরীয় আরব নেতাদের আকৃষ্ট করার জন্য।

এতে আছে “এমবিএস রিং” এবং “এমবিজেড সেন্ট্রাল” মহাসড়ক, যার নামকরণ করা হয়েছে যথাক্রমে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের মোহাম্মদ বিন সালমান ও মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের নামে। এছাড়া গাজা-ইসরায়েল সীমান্তে “ইলন মাস্ক স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং জোন” প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ চালিত গাড়ি কোম্পানিগুলো গাড়ি নির্মাণ করবে ইউরোপে বিক্রি করার জন্য। এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল ট্রাম্পের সাথে মাস্কের ‘বিচ্ছেদ’ হওয়ার আগে, তাই এখানে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে।

প্রায় ৮,৫০,০০০ হাউজিং ইউনিটের এই প্রকল্পে স্মার্ট সিটি গড়ে তোলা হবে। এর জন্য প্রায় ২০ লক্ষ ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করা হবে। গাজাকে স্বর্গ বানানোর এই প্রকল্পে ইতোমধ্যে ১,০০০ ইসরায়েলি পরিবার আগ্রহ দেখিয়েছে।

তবে গাজার গণহত্যা যে কেবল যুদ্ধপরবর্তী ব্যবসায়িক স্বার্থের জন্যই করা হচ্ছে এমন নয়। গণহত্যা চলাকালীন ব্যবসায়িক স্বার্থও কম নয়। সম্প্রতি অধিকৃত ফিলিস্তিন বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যেখানে বিগ টেক কোম্পানি থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রথম সারির কোম্পানিগুলোর মুখোশ উন্মোচন করেছেন, যারা এই গণহত্যা থেকে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হচ্ছে। এর প্রতিদান হিসাবে আমেরিকার তরফ থেকে তাকে দেওয়া হয় নিষেধাজ্ঞা

গাজা মূলত পশ্চিমা অস্ত্র ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একটা ল্যাবরেটরিতে পরিণত হয়েছে। আইবিএম ইসরায়েলের সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়, যার একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে ফিলিস্তিনিদের বায়োমেট্রিক ডেটা সংগ্রহ করা। এইচপি কোম্পানি ইসরায়েলের দখলদার বাহিনী, কারাগার আর পুলিশ বাহিনীকে প্রযুক্তিগত সুবিধা দিয়ে থাকে। পেগাসাসের মতো স্পাইওয়্যার কোম্পানিগুলোকে ব্যবহার করা হয় ফিলিস্তিনিদের ওপর নজরদারি করার জন্য।

মাইক্রোসফট যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তাদের সবচেয়ে বড় কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে ইসরায়েলে, যেখানে তারা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীকে প্রযুক্তিগত সেবা দিয়ে থাকে। এছাড়া গুগল আর আমাজন ইসরায়েলে ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি করেছে।

এমআইটির মতো সম্মানজনক প্রতিষ্ঠান ইসরায়েলের সাথে কাজ করছে ড্রোন নির্মাণের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রপ্রযুক্তির জন্য। “ল্যাভেন্ডার”, “গসপেল”, “হোয়ার ইজ ডেডি?” নামের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে গাজায় হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের জন্য। এছাড়া ক্যাটারপিলার, ভলভো, হুন্দাইয়ের মতো কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে গাজা ও পশ্চিম তীরের বাড়িঘর, মসজিদ আর অবকাঠামো ধ্বংসের জন্য ভারী যন্ত্রপাতি সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে।

চিরায়ত অস্ত্র কোম্পানিগুলোই কেবল অস্ত্র বিক্রি করে লাভজনক ব্যবসা করছে না। এই গণহত্যার সাথে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের প্রথম সারির ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো। এরা যেন মুনাফার জন্য হিতাহিত জ্ঞান আর মানবতা শূন্য হয়ে পড়েছে। দিন শেষে পরাজিত কেবল ফিলিস্তিনিরাই।

This post was viewed: 32

আরো পড়ুন