বলা হয়ে থাকে, সকালের সূর্য পুরো দিনের পূর্বাভাস দেয়। সদ্য সমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে এই কথাটি আরও একবার প্রমাণিত হয়েছে।
পাঁচ বছর আগে বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে যে পূর্বাভাস পাওয়া গিয়েছিল, তার পরিণতি বাস্তবে চিত্রায়িত হলো পাঁচ বছর পর হওয়া আরেকটি নির্বাচনের ফল ঘোষণার মধ্যে দিয়ে। পাঁচ বছর আগে মমতা তার এক সময়ের বিশ্বস্ত সেনাপতি শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন নন্দীগ্রামে। আর এবার হারলেন নিজের দুর্গ হিসেবে পরিচিত কলকাতার ভবানীপুর কেন্দ্রে।
পাঁচ বছর পূর্বে নন্দীগ্রামে ওই হারের পর যে ভবানীপুর কেন্দ্র মমতাকে মুখ্যমন্ত্রী পদে টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল, এবার সেই আসনেও হেরে রাজ্যসভার মসনদ থেকে বিদায় ঘটল তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আর রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন তাকেই পরাজিত করা একসময়ের তৃণমূল নেতা শুভেন্দু অধিকারী। এর আগেরবার শুধু নন্দীগ্রামে জয়ের মধ্য দিয়ে পরিবর্তনের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন শুভেন্দু। সেই পূর্বাভাসকে সত্যি করে এবার নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর উভয় আসনেই বিশাল জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন তিনি।
২০১১ সালে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিবর্তনের সেই স্লোগান তাকে শুধু ক্ষমতায়ই বসায়নি, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রতীক করে তুলেছিল। কিন্তু ১৫ বছর পর ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি শুধু একটি নির্বাচনী পরাজয় নয়, এটি একটি যুগের অবসান। ক্ষমতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রামীণ উন্নয়ন, নারী কল্যাণ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় নানা কর্মসূচি চালু করেন। ‘কন্যাশ্রী’, ‘রূপশ্রী’, ‘সবুজ সাথী’- এসব প্রকল্প তাকে জনমানসে জনপ্রিয় করে তোলে। ২০১১, ২০১৬ ও ২০২১- তিনটি নির্বাচনে ধারাবাহিক জয়ের মাধ্যমে তিনি নিজের রাজনৈতিক শক্তিকে সুসংহত করেন।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও, যেখানে মমতার দল ৪২টি আসনের মধ্যে ২৯টি জিতে অভাবনীয় সাফল্যের ধারা ধরে রেখেছিল, সেখানে বিজেপি ১৮ থেকে ১২-তে নেমে ভরাডুবির ইঙ্গিতই দিয়েছিল। কিন্তু এরপর ২৩ মাসে ঘটা কিছু ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে দিয়েছে। একটি কথা সত্য, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকলে স্বাভাবিকভাবেই শাসনব্যবস্থার প্রতি জন-অসন্তোষ তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে এই অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি ছিল সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টরগুলোর একটি। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনে প্রশাসনিক জড়তা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং দলীয়করণের প্রবণতা ভোটারদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
নির্বাচনের আগে ঘটে যাওয়া আরজি কর মেডিকেল কলেজের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড রাজ্যজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এই ঘটনা নারী নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং মমতার ভাবমূর্তিতে বড় ধাক্কা দেয়। আর জি কর কাণ্ডের রেশ না কাটতেই ২০২৫ সালের এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্ট আরও বড় ধাক্কা দেয় তৃণমূলকে। স্কুল সার্ভিস কমিশন দ্বারা নিযুক্ত ২৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল করে কলকাতা হাইকোর্টের প্রদত্ত রায় বহাল রাখে শীর্ষ আদালত। আদালত উল্লেখ করে, পুরো নিয়োগ কার্যক্রমটি ছিল দুর্নীতিগ্রস্ত। ওই একই সময় মমতার ঘনিষ্ঠ সাথী ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বাসা থেকে উদ্ধারকৃত কোটি কোটি টাকার দৃশ্য মানুষের সামনে চলে আসে, যা মমতার রাজনৈতিক খাতায় তৃণমূলের দুর্নীতি ও কলঙ্কের দাগ গাঢ় করেছে।
রাজ্যে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান তৈরিতে ব্যর্থতা তৃণমূলের বিরুদ্ধে জনরোষের একটি বড় কারণ, যা ভোটের মাঠে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। এসময় বিরোধীরা ভোটারদের সামনে তুলে ধরেছে কীভাবে অবকাঠামোর চুক্তি থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র শিল্প পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে তৃণমূল নেতাদের সিন্ডিকেট রাজত্ব চলমান। এবারের নির্বাচনে মমতার একচ্ছত্র আধিপত্যের অন্যতম স্তম্ভ সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকেও বড় ধরনের ফাটল দেখা গেছে। সাবেক তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বাধীন ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ এবং নওশাদ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট’ কিছু আসনে জয়ী হওয়ায় তৃণমূলের ভোটব্যাংক কয়েক ভাগে ভাগ হয়ে যায়।
এসময় তৃণমূল কংগ্রেসের ভেতরে ভাঙন, বিশেষ করে প্রভাবশালী নেতা শুভেন্দু অধিকারী ও দলের ভোট কৌশলী হিসেবে পরিচিত মুকুল রায় ২০১৭ সালে দল ছাড়লে তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। ২০২০ সালে শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপিতে যোগ দেওয়া ছিল তৃণমূলের জন্য মরণকামড়। শুভেন্দু শুধু দলই ছাড়েননি, বরং নন্দীগ্রামে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে নিজের শক্তিমত্তা প্রমাণ করেছেন। এছাড়াও দলের ভেতরে ‘নবীন-প্রবীণ’ দ্বন্দ্ব এবং দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাদের অবহেলা, নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে না পারার সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক প্রবীণ ও কর্পোরেট সংস্কৃতি তৃণমূলের এই ভরাডুবির প্রধান কারণ।
ভারতীয় জনতা পার্টি এই নির্বাচনে কৌশলগতভাবে নিজেদের সংগঠন শক্তিশালী করে। ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজন, বিশেষ করে হিন্দু ভোটের সংহতি বিজেপির পক্ষে যায়। ফলাফল- ২৯৩ আসনের মধ্যে প্রায় ২০৬টি আসনে জয়, যা এক নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ।
২০২৬ সালের এই নির্বাচনে প্রায় ৯৩% ভোটার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে, যা রাজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো, নিজের শক্ত ঘাঁটি ভবানীপুর আসনেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়। এটি শুধু একটি আসনে পরাজয় নয়, বরং তার দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রতীকী পতনও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় একক কোনো কারণে হয়নি, বরং এটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংগঠনিক ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল। অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, দলীয় ভাঙন, বিরোধীদের কৌশলগত উত্থান- সবকিছু মিলেই এই ফলাফল তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, এই পরাজয় কি মমতার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়, নাকি এটি নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সূচনা?