Ridge Bangla

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিপফেক: আসন্ন নির্বাচনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর নতুন শঙ্কা

​একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির জয়জয়কার যেমন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন কিছু জটিল সংকট। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত প্রযুক্তি ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বা এআই (Artificial Intelligence) এখন আর কেবল বিজ্ঞানের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পৌঁছে গেছে সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে।

তবে এই প্রযুক্তির একটি অন্ধকার দিক হলো ‘ডিপফেক’ (Deepfake), যা ব্যবহার করে কারো অবিকল কণ্ঠস্বর বা ভিডিও তৈরি করা সম্ভব। বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ডিপফেক প্রযুক্তি এখন এক বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করতে এই প্রযুক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

​ডিপফেক আসলে কী?

​ডিপফেক হলো এআই-এর একটি বিশেষ শাখা ‘ডিপ লার্নিং’ ব্যবহার করে তৈরি করা কৃত্রিম মিডিয়া। এর মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির ছবি, ভিডিও বা অডিও এমনভাবে পরিবর্তন করা হয় যে, তা দেখে বা শুনে বোঝার উপায় থাকে না যে সেটি নকল। একজন রাজনীতিবিদের পুরনো কোনো ভাষণের ভিডিওতে তার ঠোঁটের নড়াচড়া এবং কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করে তাকে দিয়ে এমন কিছু বলানো সম্ভব, যা তিনি কখনো বলেননি। এটি সাধারণ ‘ফটোশপ’ বা সাধারণ ভিডিও এডিটিংয়ের চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য।

​বাংলাদেশের নির্বাচনে সম্ভাব্য ঝুঁকি

​বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং উত্তপ্ত। এখানে একটি ছোট গুজবও বড় ধরনের সহিংসতা বা অস্থিরতার জন্ম দিতে পারে। আসন্ন নির্বাচনে ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেক ধরনের অপপ্রচারের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কোনো প্রার্থীর একটি ভুয়া ভিডিও তৈরি করে তাকে ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানোর মতো বক্তব্য দিতে দেখা যেতে পারে। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে যখন সত্যতা যাচাইয়ের সময় কম থাকে, তখন এ ধরনের ভিডিও ভোটারদের মনে স্থায়ী প্রভাব ফেলে দেয়। ​এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আজকাল প্রায়ই বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার গোপন ফোনালাপের অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়। এআই ব্যবহার করে এখন কারো অবিকল কণ্ঠ নকল করা পানির মতো সহজ। এ ধরনের ‘এআই জেনারেটেড অডিও’ ব্যবহার করে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা কমানোর চেষ্টা করা হতে পারে।

​কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নির্বাচনের দিন কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ভোট বন্ধ হয়ে গেছে বা নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে- এমন ভুয়া সংবাদ প্রচার করে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া থেকে বিরত রাখার অপচেষ্টা চালানো হতে পারে। আরেকটি অদ্ভুত সংকটের উৎপত্তি হতে পারে। যখন মানুষ জানতে পারে যে ভিডিও নকল করা সম্ভব, তখন তারা আসল ভিডিওকেও ‘ডিপফেক’ বলে অস্বীকার করতে শুরু করে। এর ফলে প্রকৃত সত্যও অনেক সময় গুরুত্ব হারায়।

​ডিজিটাল লিটারেসি ও সামাজিক বাস্তবতা

​বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও ‘ডিজিটাল লিটারেসি’র হার তুলনামূলক কম। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে মানুষ ভিডিও বা অডিওর সত্যতা যাচাই না করেই বিশ্বাস করে এবং শেয়ার দেয়। এই অসচেতনতাই হবে ডিপফেক অপপ্রচারকারীদের সবচেয়ে বড় সুযোগ। একবার কোনো ভুয়া ভিডিও ভাইরাল হয়ে গেলে, তার প্রতিবাদ বা ফ্যাক্ট-চেক সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে যায়।

​মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ ও প্রস্তুতি

​ডিপফেক মোকাবিলা করা কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বহুমুখী পদক্ষেপ।

​নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সাথে সমন্বয় করে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে। ভুয়া সংবাদ বা ভিডিও শনাক্ত হওয়া মাত্রই তা প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে ফেলার ব্যবস্থা নিতে হবে। এর পাশাপাশি সাইবার নিরাপত্তা আইনের অধীনে ডিপফেক বা এআই-এর অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন এর মাধ্যমে বাক-স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ না হয়। বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে ‘রুমার স্ক্যানার’ বা ‘বিডি ফ্যাক্ট চেক’ বা ‘দ্য ডিসেন্ট’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রচারের ব্যবস্থা করা জরুরি।

​টেক জায়ান্টদের দায়বদ্ধতা

ফেসবুক (মেটা), ইউটিউব এবং টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাদের অ্যালগরিদম আরও উন্নত করতে হবে, যাতে এআই-এর মাধ্যমে তৈরি অপপ্রচার স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা যায়। ​ডিপফেক বা এআই-এর অপব্যবহার থেকে বাঁচার প্রধান উপায় হলো সচেতনতা। ভোটার হিসেবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ইন্টারনেটে দেখা সবকিছুই সত্য নয়। বিশেষ করে চাঞ্চল্যকর বা উসকানিমূলক কোনো সংবাদ দেখলে তার উৎস যাচাই করা এবং একাধিক সংবাদমাধ্যমে তার সত্যতা খোঁজ করা উচিত।

​প্রযুক্তি যেমন অভিশাপ নিয়ে আসতে পারে, তেমনি সচেতনতা ও সঠিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে তাকে আশীর্বাদে পরিণত করাও সম্ভব। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হবে নাকি সহায়ক, তা নির্ভর করছে আমরা কীভাবে একে মোকাবিলা করছি তার ওপর। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ডিপফেক বা এআই-এর অপপ্রচার রুখে দেওয়া কেবল রাজনৈতিক দল বা সরকারের দায়িত্ব নয়, বরং এটি দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে ডিজিটাল বিভ্রাট রুখে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

This post was viewed: 14

আরো পড়ুন