দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রধান কেন্দ্র পাবনা মানসিক হাসপাতাল। কিন্তু এই বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রটি বর্তমানে এক গভীর সংকটের মুখে। একদিকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের ‘দর্শনার্থী বাণিজ্য’, অন্যদিকে কতিপয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অতি উৎসাহী মানুষের সংবেদনশীল এই স্থানটিকে পর্যটনকেন্দ্র ভেবে ভিড় জমানো- সবই হচ্ছে বাধাহীনভাবে। ফলে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং রোগীদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন অনুসন্ধান ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, দায়িত্বরত কর্মীদের হাতে কিছু টাকা দিলেই উন্মুক্ত হয়ে যাচ্ছে আবাসিক রোগীদের ওয়ার্ড। এরপর ভেতরে ঢুকে নানা ধরনের অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি থেকে শুরু করে ভিডিও তৈরি করা, অদ্ভুত দৃষ্টিতে সেবা নিতে আসা রোগীদের দিকে তাকিয়ে থাকা- সবই ঘটছে কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই। যেন তারা চিড়িয়াখানার কোনো কিম্ভুতকিমাকার প্রাণী।
অথচ হাসপাতালের প্রবেশপথেই বড় সাইনবোর্ডে লেখা, ‘মানসিক স্বাস্থ্য আইন ২০১৮ অনুসারে কোনো দর্শনার্থীর হাসপাতাল অভ্যন্তরে প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ প্রবেশ করলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ কিন্তু বাস্তবে এই সতর্কবার্তা কেবলই এক প্রতীকী নির্দেশনা মাত্র।
সম্প্রতি দেখা গেছে, প্রবেশপথে দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের একটি চক্র ৫০-১০০ টাকার বিনিময়ে বহিরাগতদের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে। নারী-পুরুষ, শিশুসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষ নির্বিঘ্নে হাসপাতালের আবাসিক ওয়ার্ডগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আনসার সদস্যদের এমন কর্মকাণ্ডে হাসপাতালের নিরাপত্তাবলয় এখন এক নিছক প্রহসনে পরিণত হয়েছে।
আর এই সুযোগেই সামাজিক মাধ্যমের তথাকথিত কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কাছে পাবনা মানসিক হাসপাতাল এখন এক ভিডিও তৈরির রঙ্গমঞ্চে পরিণত হয়েছে। ইউটিউবার ও টিকটকাররা রোগীদের অবস্থাকে পুঁজি করে হরেক রকমের ভিডিও তৈরি করছেন। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, রোগীদের সঙ্গে অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি করা হচ্ছে, তাঁদের গায়ে হাত দেওয়া হচ্ছে, এমনকি সিগারেট খাইয়ে টিটকারি করা হচ্ছে, যার পুরোটাই উত্ত্যক্ত করা বলা যায়। হাসপাতালের বারান্দায় রোগীদের ঘিরে মানুষের এই ভিড় তাদের জন্য চরম বিভ্রান্তিকর ও মানসিকভাবে ক্ষতিকর। এতে রোগীর ব্যক্তিগত চিকিৎসার গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও চিকিৎসকেরা।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মানসিক রোগীদের জন্য এমন পরিবেশ তাদের সুস্থ হওয়ার প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করে এবং তাদের মানসিক অবস্থাকে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দেয়। মানবাধিকারকর্মী ও চিকিৎসকদের মতে, রোগীদের সঙ্গে এমন আচরণ মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। হাসপাতালে একজন রোগী সুস্থতার প্রত্যাশায় আসেন, অথচ হাসপাতালের ভেতরেই তিনি যখন সর্বসাধারণের কৌতূহলের পাত্রে পরিণত হন, তখন তা তাঁর ব্যক্তিসত্তার ওপর আঘাত হানে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক রোগীর স্বজন জানান, রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও এই ভিডিওগুলোর কারণে সামাজিকভাবে বিদ্রুপের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন, যা তাদের সামাজিক পুনর্বাসনের পথকে রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
মানসিক রোগীদের সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১৮ সালে মানসিক স্বাস্থ্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। একইসঙ্গে জেলা মানসিক স্বাস্থ্য রিভিউ ও মনিটরিং কমিটিকে এই বিষয়ে আসা বিভিন্ন অভিযোগ প্রতিকারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এসবের প্রায়োগিক কার্যক্রম নেই কোথাও। আইন এবং কমিটির কার্যক্রম ফাইলবন্দি হয়েই ধুলোর আস্তরণে চাপা পড়ে আছে। আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বলেন, মানসিক রোগীদের সুরক্ষা নীতিমালা থাকলেও বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই। রোগীদের অবহেলা-অবমাননা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও উপহাসের জন্য সুস্পষ্ট শাস্তির বিধান উল্লেখ নেই। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এ ধরনের অপরাধের কোনো প্রতিকার মিলছে না।
দিনশেষে পাবনা মানসিক হাসপাতাল কোনো বিনোদনকেন্দ্র নয়, এটি একটি চিকিৎসাকেন্দ্র। এখানে যে বা যারা চিকিৎসার প্রয়োজনে ভর্তি আছেন, তারা আমাদের সমাজেরই অংশ। তাঁদের অসুস্থতাকে পুঁজি করে যারা বাণিজ্য বা বিনোদন খুঁজছেন, তারা শুধু আইনই অমান্য করছেন না, বরং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করছেন। অবিলম্বে হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া মনিটরিং কমিটির কার্যক্রমকে পুরোদমে সক্রিয় করার বিকল্প নেই।