Ridge Bangla

ঐতিহ্যবাহী মোরগ লড়াইয়ের ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা

বাংলাদেশে গ্রামবাংলার মাঠে-ঘাটে কানামাছি, ফুটবল, ক্রিকেট বা হা-ডু-ডু- এসব খেলার সঙ্গে আমাদের পরিচয় দীর্ঘদিনের। এসব ক্রীড়া যেমন বিনোদনের উৎস, তেমনি শারীরিক ও মানসিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সময়ের বিবর্তনে কিছু ঐতিহ্যবাহী খেলা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে একটি হলো মোরগ লড়াই, যা একসময় গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবেই পরিচিত ছিল।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও পহেলা বৈশাখের মেলায় বহু বছরের পুরনো ঐতিহ্য মোরগ লড়াই আয়োজন করা হয়। ২০২৬ সালের বৈশাখী মেলায় মাদারীপুরের কালকিনি এবং বগুড়া জেলায় এই খেলার জমজমাট আয়োজন লক্ষ্য করা গেছে। টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম এবং সিলেটের গ্রামীণ এলাকাতেও এই খেলার প্রচলন রয়েছে।

শৈশব থেকেই খেলাধুলা মানুষের বেড়ে ওঠার অবিচ্ছেদ্য অংশ। মোরগ লড়াই মূলত ‘আশিল’ জাতের মোরগকে ব্যবহার করে পরিচালিত হয়। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শৌখিন মোরগ মালিকরা এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। খেলার মূল আকর্ষণ হলো দুই মোরগের মুখোমুখি লড়াই, যা দর্শকদের জন্য বিনোদনের পাশাপাশি সামাজিক মিলনের একটি মাধ্যম হিসেবেও বিবেচিত হয়। তবে এই খেলা নিয়ে বিতর্কও কম নেই। প্রাণীদের কষ্ট দেওয়া ও লড়াই করানোকে অনেকে ‘অমানবিক’ আখ্যা দেন। জুয়াভিত্তিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অনেক জায়গায় এর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। প্রশাসন মাঝে মাঝে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিলেও অনেক ক্ষেত্রে এটি অবৈধ উপায়ে চালু থাকে।

গ্রামবাংলার লোকজ সংস্কৃতির একটি প্রাচীন ও বহুল পরিচিত ঐতিহ্যবাহী খেলা হলো ‘আসিল মোরগ লড়াই’, যা অনেক এলাকায় ককফাইট নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে সিলেট, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে, এই খেলা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।

মোরগ লড়াই মূলত গ্রামবাংলার মেলা, সংক্রান্তি কিংবা উৎসবের সময় আয়োজন করা হতো। এতে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত দুটি মোরগকে নির্দিষ্ট একটি বৃত্তাকার স্থানে ছেড়ে দিয়ে মুখোমুখি লড়াই করানো হতো। ধারণা করা হয়, প্রায় ছয় হাজার বছর আগে পারস্যেই এর সূচনা। পরে ভারত, চীন ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এ খেলার বিস্তার ঘটে। প্রাচীনকালে ভারতীয় লাল বনমোরগ এই খেলার মূল উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো।

প্রাচীন গ্রিসে খ্রিস্টপূর্ব ৫ম বা ৬ষ্ঠ শতকের দিকে মোরগ লড়াই একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় খেলা বা বিনোদন হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল। গ্রিসে খ্রিস্টপূর্ব ৫২৪–৪৬০ সালের মধ্যে প্রবেশ করা মোরগ লড়াই রোম ও উত্তর ইউরোপেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইতালি, জার্মানি, স্পেনের মতো দেশেও এটি উচ্চবিত্ত সমাজে বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি পায়। ইংল্যান্ডে ষোড়শ থেকে ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত রাজন্যবর্গ ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে মোরগ লড়াই ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। ১৬৪৬ সালে এই খেলার প্রথম প্রামাণ্য দলিল পাওয়া গেছে, যদিও এর উল্লেখ জর্জ উইলসনের ১৬০৭ সালের গ্রন্থেও পাওয়া যায়।

আজও কম্বোডিয়ায় মোরগ লড়াই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক চিহ্ন হিসেবে টিকে আছে। প্রাচীন বায়ন মন্দিরের পাথরের খোদাইতে মোরগ লড়াইয়ের দৃশ্য দেখা যায়। এখানে উৎসব, সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা ধান কাটা মৌসুমের শেষে এই খেলার আয়োজন করা হয়। প্রাচীনকালে বিজয়ী মোরগের মালিককে নতুন ধানের পানীয় বা ওয়াইন উপহার দেওয়া হতো, আর মোরগকে দেওয়া হতো এক বস্তা চাল। এভাবে ক্রীড়া ও সামাজিক বন্ধন দুটোই জোরদার হতো।

কম্বোডিয়ার বাটাম্বাং প্রদেশে শক্তিশালী মোরগের জন্য খ্যাতি রয়েছে। এখানে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মোরগের সঙ্গে সংকরায়ণ করে লড়াইয়ের উপযোগী জাত তৈরি করা হয়। এসব মোরগকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং পুষ্টিকর খাদ্য, যেমন বাদাম, ঘি, মাংস, ডিম, দুধ ও ভিটামিন খাওয়ানো হয়। লড়াইয়ের আগে মালিকরা সমান শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বী খুঁজে নেন। মোরগের আকার, শক্তি ও অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নির্ধারণ করা হয়।

তবে মোরগ লড়াইয়ের অন্ধকার দিকও রয়েছে। লড়াইয়ের সময় মোরগের পায়ে ধারালো অস্ত্র বেঁধে দেওয়া হয়, যা সংঘর্ষকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। কখনো কখনো এতে বিষাক্ত পদার্থও ব্যবহার করা হয়। লড়াই শুরুর আগে মোরগকে উত্তেজিত করার জন্য বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করা হয়। একবার লড়াই শুরু হলে তা রক্তাক্ত সংঘর্ষে রূপ নেয়। দর্শকদের জন্য কিছু নিয়ম থাকলেও বাস্তবে এই খেলার কারণে দর্শকদের মধ্যে বিবাদ-ঝগড়াও ঘটতে দেখা যায়।

বর্তমান বিশ্বে প্রাণী অধিকার ও নৈতিকতার প্রশ্নে মোরগ লড়াই ব্যাপক সমালোচিত। অনেক দেশে এটি নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশেও আইনি বাধা ও সামাজিক সচেতনতার কারণে এই খেলা প্রায় বিলুপ্তির পথে। ইতিহাসের অংশ হিসেবে মোরগ লড়াই একসময় মানুষের বিনোদন, সামাজিক যোগাযোগ এবং সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিনোদনের ধরন বদলালেও ঐতিহ্যের স্মৃতি কখনো পুরোপুরি মুছে যায় না। মোরগ লড়াইও তেমনই এক দ্বৈত বাস্তবতার প্রতীক; একদিকে এটি গ্রামবাংলার প্রাচীন সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের স্মারক, অন্যদিকে আধুনিক নৈতিকতা ও প্রাণী অধিকারবোধের সঙ্গে এর সংঘাত স্পষ্ট। তাই ইতিহাসের অংশ হিসেবে এই খেলার অস্তিত্ব স্বীকার করেও মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দিয়ে সচেতন ও দায়িত্বশীল দৃষ্টিভঙ্গিই হওয়া উচিত আমাদের পথচলার মূল ভিত্তি।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন