ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে ভারতীয় ভূখণ্ডের কয়েক কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং বিস্তীর্ণ এলাকা দখলের অভিযোগ তুলেছে একটি আদিবাসী সংগঠন। তবে এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া ও আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলের আদিবাসীদের সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি দাবি করেছে, চীনা সেনাবাহিনী ভারতীয় ভূখণ্ডের কয়েক কিলোমিটার অভ্যন্তরে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। তাদের অভিযোগ, এ কারণে গত ৬ বছর ধরে স্থানীয়রা চাষাবাদ, পশুচারণ ও বনজ সম্পদ সংগ্রহ করতে পারছেন না।
অন্যদিকে ভারতীয় সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, অরুণাচল প্রদেশে চীনা সামরিক বাহিনীর অনুপ্রবেশ এবং সেখানে ঘাঁটি স্থাপনের অভিযোগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো ভুল এবং ভিত্তিহীন।
অরুণাচল প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে, তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় নাহ আদিবাসীদের বসবাস। সংগঠনটির সভাপতি কেরু চাদের টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেন, ‘ওই জমি আমাদের পূর্বপুরুষদের। সেখানে বহু যুগ ধরে তারা শিকার, পশুচারণ এবং চাষাবাদ করেছেন।’
তার অভিযোগ, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা সংলগ্ন আপার সুবনসিরি জেলার অন্তত ৫টি এলাকায় চীনা সেনাবাহিনী ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশ করে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করেছে এবং স্থানীয়দের সেখানে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে।
কেরু চাদের আরও বলেন, প্রায় ১২ বছর আগে মাঝেমধ্যে চীনা সেনারা ওই এলাকায় প্রবেশ করলেও ২০২০ সালে তারা স্থায়ীভাবে ওই অঞ্চলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। তিনি বলেন, ‘কার্যত ওই সময় থেকেই আমাদের সেখানে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে।’
তার দাবি, আসাফিলা এলাকার ওয়িং ও পানিয়ার, মারপান, পোত্রাং এবং টিনডিংতাং এলাকায় এ ধরনের দখলদারির ঘটনা ঘটেছে। এসব এলাকা তাকসিং সদর দপ্তরের কাছাকাছি এবং স্থানীয়দের কাছে কয়েকটি স্থান তীর্থস্থান হিসেবেও পরিচিত।
এর আগে লাদাখেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় স্থানীয় পশুপালকদের ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগ করা হয় চীনা সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। তবে তখন কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছিল, লাদাখে ভারতের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডও চীনের দখলে যায়নি।
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি আপার সুবনসিরি জেলার ডেপুটি কমিশনারের কাছে একটি স্মারকলিপি দিয়েছে নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। সেখানে বলা হয়েছে, ‘কয়েক বছর আগেও যেসব পূর্বপুরুষের জমিতে আমরা অবাধে শিকার করতাম, বনজ সম্পদ সংগ্রহ করতাম এবং গবাদিপশু চরাতাম, সেগুলো এখন চীনা সামরিক বাহিনীর দখলে।’
সংগঠনটির দাবি, তাকসিং রাজস্ব সার্কেলের আওতাধীন ৫টি এলাকায় ধীরে ধীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বিস্তার করছে চীন। আন্তর্জাতিক সীমান্তসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো কৌশলগতভাবে দখল করে সেখানে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে তারা।
নাচো এলাকার বিধায়ক নাকাপ নালো বলেন, বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই অভিযোগগুলো প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘এটি জাতীয় ইস্যু হওয়ায় অভিযোগগুলো নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ রয়েছে।’
স্মারকলিপিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, গত ১০ থেকে ১৫ বছরে তাকসিং সীমান্ত এলাকায় চীনা সেনাবাহিনীর তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাদের উদ্দেশ্য যত বেশি সম্ভব এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া বলেও দাবি করেছে সংগঠনটি।
এ ছাড়া ভারতের ভূখণ্ডের ভেতরে চীনা সেনাবাহিনী সামরিক ক্যাম্প ও সড়ক নির্মাণ করেছে বলেও স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেরু চাদের বলেন, ‘ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। তারা বহু বছর ধরে আমাদের সীমান্ত রক্ষা করছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু তাদের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। তাকসিং এলাকায় চীনা সামরিক বাহিনীর তৎপরতার গতি ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আমরা প্রতিদিন ইঞ্চি ইঞ্চি করে আমাদের ভূমি হারাচ্ছি।’
তবে এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন বা অরুণাচল প্রদেশ সরকার এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জেলা প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।