Ridge Bangla

অপতথ্যের আগ্রাসন: সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া তথ্যের বিস্তারে দেখা দিচ্ছে নতুন সংকট

বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যম এখন আর শুধু যোগাযোগ কিংবা বিনোদনের প্ল্যাটফর্ম নয়। এটি জনমত গঠন, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই ডিজিটাল বিস্তারের পাশাপাশি ভয়াবহভাবে বেড়েছে ভুল তথ্য, গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসের পরিসংখ্যান সেই উদ্বেগকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে দেশে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১ হাজার ৯৭৪টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় ১৩৬ শতাংশ বেশি। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ডিজিটাল দুনিয়ায় ক্রমবর্ধমান তথ্যসংকটের প্রতিফলন।

প্রতিবেদনটিতে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে ফেসবুকে। তিন মাসে এই প্ল্যাটফর্মে ১ হাজার ৭৩২টি ভুয়া তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ১৯টিরও বেশি বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে। এছাড়া টিকটকে ৩৬৮টি, ইউটিউবে ১১৫টি, ইনস্টাগ্রামে ২৬৪টি এবং থ্রেডসে ৫১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এসব তথ্য প্রমাণ করে, অপতথ্যের বিস্তার এখন আর কোনো একক প্ল্যাটফর্মের সমস্যা নয়, বরং এটি পুরো ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে ছড়িয়ে পড়ে বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রচারণা এবং বৈশ্বিক নানা ইস্যু ভুল তথ্যের বিস্তারকে ত্বরান্বিত করেছে। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য, পুরনো ছবি বা ভিডিও নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার এবং মনগড়া দাবি ব্যাপকভাবে ছড়ানো হয়েছে। রাজনৈতিক বিভাজনের বাস্তবতায় এসব তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমের অ্যালগরিদমভিত্তিক কাঠামোও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। যেসব কনটেন্ট বেশি আবেগ, ক্ষোভ কিংবা ভয় সৃষ্টি করে, সেগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ফলে যাচাই-বাছাইহীন তথ্য অল্প সময়ে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। ব্যবহারকারীরা অনেক সময় এসব তথ্যের উৎস যাচাই না করেই শেয়ার করছেন, যা অপতথ্যের বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হলো নারীদের লক্ষ্য করে অপপ্রচার বৃদ্ধি। রিউমার স্ক্যানারের তথ্যে দেখা গেছে, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এ বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৪৭২টি ভুল তথ্য নারীদের কেন্দ্র করে ছড়ানো হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারীদের নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কখনো ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে, কখনো ভুয়া বক্তব্য বা কেলেঙ্কারির গল্প তৈরি করে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল ব্যক্তিগত মানহানির বিষয় নয়, বরং এর মাধ্যমে জনপরিসরে নারীদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করার একটি সাংস্কৃতিক প্রবণতা তৈরি হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে নারী সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, অধিকারকর্মী কিংবা সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপপ্রচার এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা। এতে নারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও সংকুচিত হচ্ছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি সাইবার অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আইনে ছয় মাসের মধ্যে সাইবার মামলার বিচার সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বহু পুরনো মামলা এখনও ট্রাইব্যুনালে ঝুলে আছে। অনেক ভুক্তভোগী মামলা করেও পরে তা প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে অপরাধীরা এর সুযোগ নিচ্ছে, যা তাদের এই ধরনের কার্যক্রমের পরিধি বাড়াতে উৎসাহিত করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র আইন প্রণয়ন করে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দক্ষ তদন্ত ব্যবস্থা, দ্রুত বিচার এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি। একই সঙ্গে গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো ছাড়া অপতথ্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন।

বিশ্বজুড়েই এখন ইনফোডেমিক বা তথ্য-মহামারির বিষয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। সামাজিক মাধ্যমের বিস্তার যেমন মানুষকে অবাধ মতপ্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছে, তেমনি ভুল তথ্যের বিস্তার সমাজে অবিশ্বাস, বিভাজন ও সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। একটি ভুয়া পোস্ট কখনো সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে, কখনো রাজনৈতিক সংঘাত উসকে দিচ্ছে, আবার কখনো ব্যক্তির জীবন ও সুনাম ধ্বংস করছে।

এই বাস্তবতায় অপতথ্য মোকাবিলা এখন শুধু প্রযুক্তিগত বা আইনি চ্যালেঞ্জ নয়, এটি গণতন্ত্র, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন। তাই দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজন দায়িত্বশীল ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে তথ্য শেয়ার করার আগে যাচাই করার অভ্যাস সামাজিক আচরণের অংশ হয়ে উঠবে। তাহলেই কেবল সামাজিক মাধ্যমকে বিভ্রান্তির অস্ত্র নয়, বরং ইতিবাচক জনপরিসর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

This post was viewed: 7

আরো পড়ুন